পটুয়াখালী এলজিইডিতে অনিয়ম

এলাকার নয়, নিজেদের 'উন্নয়নে' ব্যস্ত তারা

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২০     আপডেট: ২৬ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের বাজিতা গ্রামে আইবিআরপি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবদুল হাইয়ের বাড়ির সামনে নির্মিত হচ্ছে গার্ডার ব্রিজ	- সমকাল

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের বাজিতা গ্রামে আইবিআরপি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবদুল হাইয়ের বাড়ির সামনে নির্মিত হচ্ছে গার্ডার ব্রিজ - সমকাল

পটুয়াখালীতে উন্নয়নের নামে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে প্রকল্প পরিচালক আবদুল হাইর নিজের বাড়ি এবং নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুস সাত্তার হাওলাদারের শ্বশুরবাড়ির সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে শতকোটি টাকা। শুধু তাই নয়, স্থান নির্ধারণ, জরিপ, প্রাক্কলন তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন ও দরপত্র আহ্বানের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক ছাড়া এলজিইডির সংশ্নিষ্ট অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানেন না। এমনকি প্রকল্পের জন্য বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সদর উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন সড়কের আইডি নম্বর। অভিযোগ উঠেছে, এলাকার বদলে নিজেদের উন্নয়নেই ব্যস্ত নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক। তবে তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
জানা গেছে, নিজের বাড়ি শোভাবর্ধনের জন্য জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার নিজ গ্রামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭টি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করাচ্ছেন আইবিআরপি প্রকল্পের পরিচালক আবদুল হাই। আর তার এই অনিয়মের সুযোগ নিয়ে এলজিইডির পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুস সাত্তার হাওলাদার নিজের শ্বশুরবাড়ির এলাকার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য পৌর এলাকার মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬টি সেতু নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করেন। এলজিইডির এই দুই কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতিতে স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
পটুয়াখালী এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ জনপদের ব্রিজ, কালভার্ট-সেতু মেরামত ও উন্নয়ন (আইবিআরপি) প্রকল্পের অর্থায়নে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ২৮ এপ্রিল স্বাক্ষরিত ৪২ ও ৪৩ নম্বর নোটিশে ১৯টি গার্ডার ব্রিজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়ে কাজও শুরু করে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ১৯টির মধ্যে ১৭টি ব্রিজই প্রকল্প পরিচালকের নিজ গ্রামে।
মির্জাগঞ্জের মাধবখালী ইউনিয়নের বাজিতা চতুর্থ খ গ্রামে আইবিআরপি প্রকল্পের পরিচালক আবদুল হাইর দৃষ্টিনন্দন 'ইঞ্জিনিয়ার কটেজ'। তার বাড়ির চারপাশ ঘিরে এবং মোনাসেফ সিকদার বাড়ি, হযরত আলী হাওলাদার ও আজাহার আলী হাওলাদার বাড়ির চারপাশ ঘিরেই অন্তত ১২টি ব্রিজ নির্মাণাধীন রয়েছে। এ ছাড়া বাড়ির অদূরে শিশুর বাজারের দক্ষিণ পাশে একটি ও পূর্বপাশে আরও একটি ব্রিজের কাজ চলছে। বাজারের পূর্বদিকের সড়কে আরও তিনটি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণাধীন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিজের বাড়ির শোভাবর্ধনের জন্য ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে মির্জাগঞ্জের একটি গ্রামে ১৭টি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করছেন আবদুল হাই। অথচ এই উপজেলায় ২৩৯টি এবং জেলায় এক হাজার ২০৭টি সেতুর মধ্যে ছয় শতাধিক সেতু-কালভার্ট ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী।
ওই এলাকার অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, মির্জাগঞ্জ উপজেলার দেউলী-সুবিদখালী ইউনিয়নের ডোকলাখালী গ্রামের বেড়েরধন খালের ওপর ৬০ মিটার দীর্ঘ লোহার সেতুটি সিডরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক যুগেও সেটি মেরামত করেনি কর্তৃপক্ষ। জরাজীর্ণ লোহার সেতুটির খুঁটি বেঁকে আঁকাবাঁকা হয়ে হেলে পড়েছে।
অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ির এলাকার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুস সাত্তার হাওলাদার পৌর এলাকার মধ্যে ১৬টি ব্রিজ নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করেন। এলজিইডির আহ্বানকৃত টেন্ডার নোটিশে দেখা গেছে, গত ২১ এপ্রিল নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত একাধিক নোটিশে ১২টি ব্রিজের ও চারটি লোহার সেতুর দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৩৭ নম্বর নোটিশের ৪৪৭১৮৬ নম্বর ইজিপির আইডিতে দেখা যায়, পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে একটি ব্রিজ নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। অথচ সেখানে কোনো খালের অস্তিত্বই নেই। ওখানে রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলীর শ্বশুরবাড়ি। এখানে যে ৫৭৮৯৫২০০৪ নম্বর আইডি দেখানো হয়েছে, মূলত তা সদর উপজেলা পরিষদের আয়লা জিসি ভায়া বোতলবুনিয়া ও খাটাসিয়া সড়কের আইডি নম্বর। শুধু তা-ই নয়, শ্বশুরবাড়ির সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য আধ কিলোমিটার বৃত্তের মধ্যে আরও ১৫টি ব্রিজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। এভাবে সব ব্রিজের দরপত্রে উপজেলা পরিষদের সড়কে ব্যবহূত আইডি নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবেই ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৩৬, ৩৭ ও ৩৮ নম্বর নোটিশে পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডে চারটি ব্রিজ, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আটটি ব্রিজ এবং চারটি লোহার সেতু নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, আইবিআরপি প্রকল্পে গ্রামীণ জনপদে জনসাধারণের চলাচলের জন্য লোহার ব্রিজ ও কালভার্ট নিমাণ করবে। প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী এলজিইডি পৌর এলাকার মধ্যে এ ধরনের উন্নয়ন কাজ করতে পারে না। এ প্রকল্প বাতিলের জন্য প্রধান প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপ চান ঠিকাদাররা।
এ ব্যাপারে মির্জাগঞ্জ এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী শেখ আজিমুর রশিদ বলেন, স্থানীয় প্রকৌশল প্রশাসন হিসেবে আমরা শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করি। কাজের পুরো তালিকা দেওয়া হয় প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে। এ ছাড়াও দেখা যায়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন তদবিরেও অনেক প্রকল্প হয়ে থাকে। তখন এক স্থানেই অনেকগুলো কাজের দরপত্র হয়।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুস সাত্তার হাওলাদার বলেন, তিনি পটুয়াখালীতে যোগদানের আগেই এ প্রকল্পগুলো করা হয়েছে। তা ছাড়া অনুমোদন নিয়ে পৌরসভার মধ্যে এলজিইডি দরপত্র আহ্বান করতে পারে। আর তার শ্বশুরবাড়ির সামনে ব্রিজ হলো, নাকি অন্য কোথাও হলো, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে- ওই ব্রিজ দিয়ে এলাকার লোকজনই চলাচল করবে। অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
প্রকল্প পরিচালক আবদুল হাই বলেন, এগুলো ছোট ছোট কাজ এবং অল্প টাকায় হচ্ছে। তা ছাড়া একই গ্রামে ১৭টি কেন, ১০০টি কাজও হতে পারে।
এলজিইডির পটুয়াখালীর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নূরুল হুদা জানান, এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীই ভালো বলতে পারবেন।