চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর থেকে মহামারির এই যুদ্ধে সম্মুখে থেকে লড়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। সেবা দিয়ে রোগীদের সুস্থ করে তুলতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায়। চট্টগ্রামে চিকিৎসকদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বন্দরনগরীতে এ পর্যন্ত ১০ ফ্রন্ট ফাইটার (সম্মুখ সারির যোদ্ধা) চিকিৎসক প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় তিনশ' চিকিৎসক। কম সময়ে এতসংখ্যক চিকিৎসকের প্রাণহানি ও সংক্রমিত হওয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে চিকিৎসক সমাজে।

চট্টগ্রামে ঈদুল ফিতরের দিন গত ২৫ মে প্রথম চিকিৎসক জাফর হোসেন রুমি মারা যান। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান মা ও শিশু হাসপাতালের এ চিকিৎসক। এর এক সপ্তাহের মাথায় ৩ জুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান চট্টগ্রাম মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক প্রধান ডা. এহসানুল করিম। পরের দিন মারা যান চমেক হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. মহিদুল হাসান। ১২ জুন করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান আরেক করোনা যোদ্ধা ডা. আরিফ হাসান। ১৪ জুন উপসর্গ নিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাদেকুর রহমান। ১৭ জুন মারা যান মেট্রোপলিটন হাসপাতালের সিনিয়র আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নুরুল হক। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২১ জুন মারা যান চট্টগ্রামের প্রবীণ চিকিৎসক নাক, কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ললিত কুমার দত্ত। ২৪ জুন মারা যান চমেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সমিরুল ইসলাম বাবু। চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো এই চিকিৎসককে প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হয়। আরও কয়েকবার বিশেষ এই থেরাপি দেওয়াসহ সব ধরনের চিকিৎসা দিয়েও বাঁচানো যায়নি মানবিক এই চিকিৎসককে। তার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ওই দিন রাতে ডা. শহিদুল আনোয়ার নামে আরেক প্রবীণ চিকিৎসকের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২৬ জুন রাতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ হোসেন। গত ২০ ও ১৯ জুন দু'দিনে চট্টগ্রামে ২০ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হন।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে পিপিই, মাস্কসহ যথাযথ সুরক্ষা সামগ্রীর অপ্রতুলতার কারণে চিকিৎসকদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের হার বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এ হার দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। না হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসবে বলে মত তাদের। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, 'চিকিৎসকরা আক্রান্ত হলেও তাদের সহকর্মীরা সেবা দেওয়া থেকে পিছপা হচ্ছেন না। মৃত্যু ও আক্রান্তের কারণে একটা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। কেননা, আক্রান্তদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় অন্য হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক আনতে হচ্ছে।' বিভিন্ন সংস্থা থেকে উপহার পাওয়া সাধারণ মানের পিপিই মাস্কসহ সুরক্ষা সামগ্রীর কারণে চিকিৎসকরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন বলে অভিমত তার।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. শামীম হাসান বলেন, চিকিৎসকরা খুব কাছে গিয়ে রোগী দেখেন। এ কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। করোনা মোকাবিলায় স্বাচিপ গঠিত কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়ক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, চিকিৎসকদের মৃত্যুর এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। জীবন উৎসর্গ করা চিকিৎসকরা চট্টগ্রামবাসীর অন্তরে আজীবন বেঁচে থাকবেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. মুজিবুল হক বলেন, চট্টগ্রামে চিকিৎসক রয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার। করোনায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে নগরের পাশাপাশি উপজেলায়ও অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন।

চট্টগ্রামের করোনা রোগীদের প্রধান ডেডিকেটেড জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও করোনা টিমের ফোকাল পারসন ডা. আব্দুর রব মাসুম বলেন, করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ফ্রন্ট ফাইটারসহ ১০ চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন।