সিলেটে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের স্কুলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বিবিআইএসসি) কর্তৃপক্ষ। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে অভিভাবকরা বেতন দিতে না পারায় ইংরেজি মাধ্যমের কয়েকশ’ শিক্ষার্থীর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল আটকে রাখে নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকায় অবস্থিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যে এবারে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার জন্য স্কুলের অর্ধশতাধিক শিক্ষককে স্কুলে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আগামী মঙ্গলবার থেকে এই নির্দেশ না মানলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকুরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। করোনা সংক্রমণের মধ্যে চাকরি হারানোর ভয়ে আছেন ওই শিক্ষকরা।

করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় গত ১৭ মার্চ থেকে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সারাদেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সময়ে অনলাইনে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষকরা বাসায় বসে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন; যাতে সরকারের অনুমোদন রয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুধু প্রশাসনিক কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অফিস খোলা রাখার সুযোগ রয়েছে। গত ৩১ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপ-সচিব মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এই নির্দেশনায় সাক্ষর করেন। সরকারি এই নির্দেশনাকে অমান্য করে বিবিআইএসসি শিক্ষকদের স্কুলে যেতে বলেছে।

এতদিন ধরে স্কুল বন্ধ থাকলেও বিবিআইএসসি’র শিক্ষকরা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন। কয়েকজন শিক্ষক জানান, বর্তমানে জুম অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষকরা নিজেদের বাসাবাড়িতে থেকে ক্লাস নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে যেকোন সময়ে ভার্চুয়াল ক্লাসে যোগ দিয়ে নজরদারির সুযোগ রয়েছে। এরপরও শিক্ষকদের ‘নজরদারির’ কথা বলে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সবাইকে স্কুলে উপস্থিত হয়ে অনলাইনে ক্লাস নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাপ্তাহিক বন্ধের দুইদিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ক্লাস হবে। এতদিন বাসায় থেকে ক্লাস নিচ্ছিলেন শিক্ষকরা।

বিসিআইএসসিতে বাংলা মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষাক্রম এবং ইংরেজি মাধ্যমে ব্রিটিশ শিক্ষাক্রমে পড়ানো হয়। এই দুই মাধ্যম মিলে ৬০ জনের মত শিক্ষক রয়েছেন; যাদের সবাই একসঙ্গে স্কুলে উপস্থিত হলে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্মচারী মিলে স্কুল চালু হলে শতাধিক লোককে উপস্থিত থাকতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলের একজন শিক্ষিকা বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সরকার সকল স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখেছেন। আমাদের স্কুল কি এই আইনের বাইরে। তিনি বলেন, এনিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করলেও তারা যুক্তি মানছেন না।’

এ ব্যাপারে একজন শিক্ষক বলেন, বিবিআইএসসি আমাদের প্রতিষ্ঠান; আমরা প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসি। আমরা মনের আনন্দে স্কুলে যেতে চাই। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে হবে। পরিবারের লোকজন যেতে নিষেধ করছেন। কিন্তু জীবিকার তাগিদে হয়ত যেতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশ থাকলে অবশ্যই যেতে হবে। কিন্তু সরকার সংক্রমণের আশঙ্কায় স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে বলেছেন।

আরেকজন শিক্ষিকা বলেন, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্যাংকসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোলার যুক্তি দিচ্ছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেউ সংক্রমিত হলে বা মারা গেলে ক্ষতিপূরণের সুযোগ রয়েছে। আমাদের কেউ মারা গেলে তো কর্তৃপক্ষ শোক প্রকাশ করেই দায়িত্ব সারবেন।’ তিনি বলেন, ‘পরিবারের উপার্জনক্ষমদের কিছু হলে পরিবারের দায় কে নেবে। কর্তৃপক্ষকে তা বলার পরও কাজ হয়নি।’

জেষ্ঠ্য একজন শিক্ষক বলেন, অনলাইনে ক্লাস থাকলেও অনেক অভিভাবক বেতন দিচ্ছেন না। এই অবস্থায় আমাদের (শিক্ষক) স্কুলে নিয়ে কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞাপন করতে চাইছেন যে- ক্লাস নিচ্ছি, বেতন দাও।

বিবিআইএসসি’র অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি রিসিভ করেননি। একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন।

উপাধ্যক্ষ নাজভিন আক্তার বলেন করেন, আগামী ১ সেপ্টেম্বর তিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন।  স্কুলে উপস্থিত হয়ে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্কুলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করলে তিনি শিক্ষকদের স্কুলে গিয়ে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিবিআইএসসি’র নির্বাহী পরিচালক মো. কাওসার জাহান সমকালকে বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা হচ্ছে না। এর মধ্যে অনেক শিক্ষক অনলাইন ক্লাসে ফাঁকি দিচ্ছেন। এই ফাঁকিবাজি বন্ধ করার জন্য সবাইকে স্কুলে এসে অনলাইনে ক্লাস নিতে বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, কিছুদিন আগে বেতন নিয়ে আমাদের অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। নতুন করে আর সমস্যায় পড়তে চাই না। এখন শিক্ষকরা স্কুলে না এসেই নানা মহলে অভিযোগ করছেন, নানা কথা বলছেন, যাদের ভালো লাগে না, তারা চলে যেতে পারেন। কারও যদি স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দেখালে ছুটি দেওয়া হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে কাওসার জাহান বলেন, ‘সরকার তো স্কুলে উপস্থিত হয়ে অনলাইনে ক্লাস নিতে নিষেধ করেননি।’

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অ‌ধিদপ্ত‌রের সিলেট বিভাগীয় উপ-প‌রিচালক (ভারপ্রাপ্ত) জাহাঙ্গীর কবীর আহাম্মদ ব‌লেন, ‘এটা সরকা‌রি নিয়ম অমান্য করা। স্কু‌লে একস‌ঙ্গে সব শিক্ষক‌কে ডে‌কে পাঠা‌নোর সু‌যোগ নেই।’ এমন হ‌লে এ‌কে অনলাইন ক্লাস বল‌বেন কিভা‌বে- এমন প্রশ্ন ক‌রেন তি‌নি।