কিশোরগঞ্জের নিকলীতে প্রবাসী ভাইয়ের বাড়িসহ প্রায় পাঁচ কোটি টাকার সম্পদ দখলের অভিযোগ উঠেছে তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে। নিকলী উপজেলা সদরের কুর্শা পশ্চিমপাড়া গ্রামের মো. জাফর আলী এবং তার অন্য দুই ভাই ইদ্রিস আলী ও রূপালী মিয়ার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তারা কেবল প্রবাসী ভাইয়ের সম্পদ দখল করেই ক্ষান্ত হননি, গ্রামবাসীকেও নানাভাবে হয়রানি করছেন।

জানা গেছে, জাফর আলীরা মোট পাঁচ ভাই। তিনি সবার বড়। মেজো ভাই সোনালী মিয়া নিরীহ প্রকৃতির। আর সবার ছোট ভাই প্রকৌশলী আবুল হাসিম অবস্থান করছেন অস্ট্রিয়ায়। দেশে থাকা দরিদ্র চার ভাই মূলত আবুল হাসিমের দেওয়া টাকাতেই সম্পদের মালিক হয়েছেন। আর তিন ভাই এখন সেই প্রবাসী ভাইয়ের সম্পদ দখল করে নিয়েছেন। জানা গেছে, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় জাফর আলীর বড় ছেলে জহিরুল হক নিকলী উপজেলা যুবদলের সহসভাপতির পদ বাগিয়ে নেন। তার ছোট ভাই ইমরুল হাসান সম্প্রতি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। রাজনৈতিক এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তারা এলাকায় বিভিন্ন অপকর্ম করছেন বলে অভিযোগ করেছেন গ্রামবাসী।

এলাকাবাসী ও আবুল হাসিমের বাড়ির ভুক্তভোগী কেয়ারটেকার রফিকুল ইসলাম রুবেল জানান, তিনি তার প্রবাসী চাচা প্রকৌশলী আবুল হাসিমের দোতলা বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। গত ১০ মে রাতে চাচা জাফর আলী, ইদ্রিস আলী ও রূপালী মিয়া এবং তাদের ছেলেরা তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ওই বাড়ি দখল করে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় আলমারি থেকে তিন লাখ টাকাসহ দুটি দামি মোবাইল ফোন সেট এবং মূল্যবান জিনিস ও কাগজপত্রও নিয়ে যান। এ ছাড়া ইদ্রিস আলী ও তার লোকজন গত এপ্রিলে নিকলী-করগাঁও মূল সড়কের সামনে আবুল হাসিমের তিন কোটি টাকার প্রায় এক একর জমি দখল করে দোকানঘর, টিনের গোডাউনসহ ব্যক্তিগত চেম্বার নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া তারা কুর্শা গ্রামের দোফসলি জমি ও নদীর পাড় দখল করে দুটি অবৈধ ইটভাটা স্থাপন করেছেন। তাদের হুমকি ও প্রভাবে ইটভাটা এলাকার পাঁচটি পরিবার নিজেদের বসতবাড়ি হারিয়েছেন।

এ ঘটনায় স্থানীয় অ্যাডভোকেট তোফায়েল হোসেন মাসুম ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করেছেন। জাফর আলীর ছেলে ও ভাতিজাদের বিরুদ্ধে একাধিক ধর্ষণেরও অভিযোগ করেছেন গ্রামবাসী। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাদের বিরুদ্ধে নিকলী থানায় কোনো মামলা করা যায় না বলে ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম রুবেল ও তার ভাই রাইসুল ইসলাম খোকন জানান। পরে তারা বাধ্য হয়ে আদালতে দুটি পৃথক মামলা করেছেন। আদালত অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারকে তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ছাড়া এই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিকলী আঠারবাড়িয়ার জমশেদ আলীসহ একাধিক ব্যক্তি নিঃস্ব হয়েছেন।

এসব ঘটনায় এলাকার জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এক সালিশে সব পক্ষের স্বাক্ষর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন অভিযুক্তরা আবুল হাসিমকে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবরের মধ্যে তার পাওনা এক কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করবেন। এ ছাড়া দখল করা তার জমি ও বাড়িও ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু পরে তারা সে সিদ্ধান্ত মানেননি।

জানতে চাইলে জাফর আলী, ইদ্রিস মিয়া ও রূপালি মিয়া তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হাসিমের বাড়ি দখল হয়নি। এটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। জমি দখলের বিষয়ে ইদ্রিস আলী বলেন, এজমালি সম্পত্তিতে তিনি দোকান, গোডাউন ও চেম্বার করেছেন। হাসিমের পাওনা টাকা ফেরত দিয়ে দেবেন বলে জানান।

নিকলী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কারার শাহরিয়ার আহমেদ তুলিপ বলেন, সালিশে সিদ্ধান্তের কপিতে তিনিসহ সবারই স্বাক্ষর রয়েছে।

জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন সুমন মোল্লা বলেন, ব্যক্তির অপকর্মের দায় ছাত্রলীগ নেবে না।

জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, ঘটনাটি জানার পর খোঁজ নিয়ে সত্যতা পাই। পরে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নিকলীর ইউএনওকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি একাধিকবার অভিযুক্তদের নিয়ে বসেছেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করলেও পরে তারা বেঁকে বসেন।

নিকলীর ইউএনও সামছুদ্দিন মুন্না বলেন, একাধিকবার চেষ্টা করেছি। সর্বশেষ গত ২৩ আগস্ট অভিযুক্তদের নিয়ে বৈঠক করেও কোনো সমাধান করতে পারিনি।

নিকলী থানার ওসি সামসুল আলম সিদ্দিকী বলেন, বাড়ি দখল ও অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় আসেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।