চট্টগ্রাম ওয়াসার ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দিনে পানির উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১৩ কোটি লিটার। এই পানি বিক্রি করে ওয়াসার আয় হতো প্রায় তিন কোটি টাকা। ওই বছরের নভেম্বরে উৎপাদনে যায় 'শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার প্রকল্প-১'। এতে পানি বাড়ে ১৪ কোটি লিটার। দুই বছর পর চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি উৎপাদন বাড়ে আরও ৯ কোটি লিটার। অর্থাৎ এখন পানি উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৩৬ কোটি লিটার। এর মধ্যে দুই দফায় পানির দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, পানির উৎপাদন ও দাম বাড়লেও এ থেকে আয় তেমন বাড়েনি। ওয়াসার কোষাগারে বর্তমানে জমা হচ্ছে মাত্র সাড়ে ১০ কোটি থেকে ১১ কোটি টাকা।

২০১৬ সালে পানির উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার পরও আয় না বাড়ায় ২০১৮ সালের মাঝামাঝি ওয়াসার সব মিটার রিডারকে লটারির মাধ্যমে এলাকা পরিবর্তন ও বদলি করা হয়। এতে একলাফে তিনগুণ রাজস্ব বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি টাকায়। এরপর নতুন করে ৯ কোটি লিটার পানি উৎপাদন ও ২৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির পরও আয়ে তেমন হেরফের না হওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, এত পানি কি তবে 'হাওয়া' হয়ে যাচ্ছে? এত পানির মূল্য যাচ্ছে কোথায়?

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পাইপ লিকেজসহ নানা কারণে বড়জোর পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ পানির অপচয় হওয়ার কথা। কিন্তু এখন ওয়াসার এক-তৃতীয়াংশ পানিই 'হাওয়া' হয়ে যাচ্ছে! কাগজে কলমে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ২৮ থেকে সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত পানি অপচয় হচ্ছে। এ হিসাবে দিনে অন্তত ১০ থেকে ১২ কোটি লিটার পানি 'অপচয়' দেখাচ্ছে ওয়াসা। অর্থাৎ বছরে কমবেশি সাড়ে চার হাজার কোটি লিটার পানি হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এতে প্রতিদিন সেবা সংস্থাটি রাজস্ব হারাচ্ছে সাড়ে তিন কোটি থেকে চার কোটি টাকা!

অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী মিটার রিডারসহ শ্রমিক লীগ ও শ্রমিক ইউনিয়নের কিছু নেতা পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছেন। 'হাওয়া' হয়ে যাওয়া পানিকে কৌশলে 'টাকায় রূপান্তর' করছেন তারা। যার মূল হোতা মিটার রিডাররা। বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিয়েও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ওয়াসায় এখন মিটার রিডার রয়েছেন ৪৬ জন। অভিযোগ রয়েছে, শুধু ওয়াসা কর্তৃপক্ষ নয়, সাধারণ গ্রাহকরাও জিম্মি তাদের হাতে।

অপচয় হওয়া পানির পরিমাণ নিয়ে খোদ ওয়াসার বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীই বিস্মিত। সমকালকে তারা বলেন, যে পরিমাণ পানি বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা যদি সত্যিই বের হয়, তা হলে অনেক এলাকাতেই বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা। বাস্তবে তা হচ্ছে না। এ থেকেই বোঝা যায়, এসব পানি কার পেটে যাচ্ছে। তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ওয়াশিং প্লান্ট, আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল, বহুতল ভবন, লাইসেন্সবিহীন গভীর নলকূপ ও শিল্প-কারখানায় পানি সরবরাহে 'নয়ছয়' করে পকেট ভারী করছেন ওয়াসার মিটার রিডাররা।

কিছুদিন পরপর চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায়, প্রতিটি বোর্ড সভায় আলোচনার অন্যতম বিষয় থাকে পানির অপচয় ও অনিয়ম। সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত ওয়াসার বোর্ড সভায়ও আলোচিত হয়েছে রাজস্ববহির্ভূত পানির বিষয়টি। পানির অপচয় কমিয়ে আনতে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে আলোচনা চললেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। গত বছরের মে মাসে পানির অপচয় ও ভূতুড়ে বিলসহ গ্রাহকদের নানা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ওয়াসার বোর্ড সদস্য জাফর আহমেদ সাদেককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে পানি অপচয়ের নানা দিক উঠে আসে। কিছু সুপারিশও করা হয়। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।

ওয়াসার পরিচালনা বোর্ডের সদস্য জাফর আহমেদ এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, 'মিটার রিডাররাই ওয়াসার পানি খেয়ে ফেলছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানি অপচয় দেখানো হচ্ছে। মিটার নষ্ট থাকার সুযোগে একেকজন গ্রাহককে মিটার না দেখে, আন্দাজে, ইচ্ছামতো বিল দেওয়া হচ্ছে। আবার এলাকাভিত্তিক মিটার না থাকার কারণেও অনিয়ম করার সুযোগ পাচ্ছেন তারা। এদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পানির অপচয় বন্ধ হবে না।'

পানির অপচয় নিয়ে সোচ্চার ওয়াসার আরেক বোর্ড সদস্য মহসিন কাজী বলেন, 'রাজস্ববহির্ভূত পানির পরিমাণ যে হারে বাড়ছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখতে আমরা একটি কমিটিও করে দিয়েছিলাম। তাতেও ফল হচ্ছে না। আমার মনে হয়, যত সমস্যা মিটার রিডিংয়েই।'

নষ্ট মিটারই যত নষ্টের মূল : অনুসন্ধানে জানা গেছে, নষ্ট মিটারগুলোই হচ্ছে যত নষ্টের গোড়া। ওয়াসায় পানি অপচয়ের ক্ষেত্রে মিটার রিডারদের প্রধান হাতিয়ার নষ্ট মিটার। এ ছাড়া গড় বিল, বাইপাস সংযোগ, অবৈধ সংযোগ এবং মিটারে বিলের ক্ষেত্রে কমবেশি করে সুবিধা আদায় করেন মিটার রিডাররা। এ কাজে তাদের সহায়তা করেন এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রকৃত বিলের চেয়ে কম বিল দেখিয়ে সুবিধা নিয়ে থাকেন মিটার রিডাররা। আবার একটি মিটার থেকে বাইপাস করে লাইন দেওয়া হয়। এ ছাড়া অবৈধ সংযোগ তো রয়েছেই।

চট্টগ্রাম ওয়াসায় মোট সংযোগ রয়েছে ৮১ হাজার ৭১৭টি। এর মধ্যে আবাসিক সংযোগ ৭৩ হাজার ৮৮৪টি এবং বাণিজ্যিক সংযোগ সাত হাজার ৮৩৩টি। কিন্তু এসব সংযোগ মিটারের মধ্যে প্রায় কয়েক হাজার মিটার নষ্ট। অভিযোগ আছে, ইচ্ছামতো বিল করতে অনেক সময় ভালো মিটারও নষ্ট করে দেন মিটার রিডাররা। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি বাইপাস এবং চোরা লাইন চিহ্নিত করতে একটি সার্ভিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছিল। এ টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, যে সংযোগ থেকে মাসের পর মাস গড়ে মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার টাকা বিল দেওয়া হতো সে সংযোগে মিটার লাগানোর পর স্বাভাবিক বিলই আসছে ৪০-৫০ হাজার টাকা। এভাবে অভিযানের ফলে রাজস্ব তখন কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু পরে এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি।

৪৬ মিটার রিডারের ৪৫০ 'বদি আলম' : চট্টগ্রাম ওয়াসায় বর্তমানে ৪৬ জন মিটার রিডার রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই মিটার রিডিংয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় যান না। তাদের একেকজনের অধীনে ১০ থেকে ১২ জন করে সহকারী রয়েছেন, যারা সরকারি নিয়োগকৃত নন। মিটার রিডাররাই কমিশনের ভিত্তিতে তাদের পুষে থাকেন। তারাই মিটার রিডিং নিয়ে থাকেন। চট্টগ্রাম ওয়াসায় এরা 'বদি আলম' নামে পরিচিত। বিভিন্ন ওয়াশিং প্লান্ট, শিল্প-কারখানা ও বহুতল ভবনে অবশ্য মিটার রিডাররাই যান। আর সাধারণ গ্রাহকদের ব্যবহূত পানির ইউনিটের পরিমাণ মর্জিমতো লিখে নিয়ে আসেন তাদের নিয়োগকৃত 'বদি আলম'রা।

তবে চট্টগ্রাম ওয়াসার শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ও মিটার রিডার মো. এনায়েতউল্লাহ বলেন, 'মিটার রিডারদের বিরুদ্ধে গণহারে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়। কিন্তু এসব অভিযোগ সত্য নয়। যদি মিটার রিডাররা দুর্নীতি করে থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষকে বলব তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে।'

মো. এনায়েতউল্লাহ বলেন, 'নানাভাবে পানি অপচয় হয়। পাইপ লিকেজ ছাড়াও নগরীতে লাইসেন্স ছাড়া অনেক গভীর নলকূপ আছে। এগুলোর মাধ্যমেও পানি চুরি হচ্ছে।' মিটার রিডারদের ব্যক্তিগত সহকারী রাখার বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি।

যে প্রকল্প থেকে যত পানি আসে : বন্দরনগরীতে দৈনিক পানির চাহিদা ৪২ কোটি লিটার। বর্তমানে ওয়াসা সরবরাহ করে ৩৬ কোটি লিটার। এর মধ্যে শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার প্রকল্প-১ থেকে পানি আসে ১৪ কোটি লিটার, মোহরা পানি শোধনাগার থেকে ৯ কোটি লিটার, শেখ রাসেল পানি শোধনাগার থেকে ৯ কোটি লিটার এবং বিভিন্ন গভীর নলকূপ থেকে চার কোটি লিটার সরবরাহ করা হয়।

চট্টগ্রাম ওয়াসায় এক হাজার লিটারকে এক ইউনিট পানি ধরা হয়। বর্তমানে আবাসিক খাতে প্রতি ইউনিট পানির দাম ১২ টাকা এবং বাণিজ্যিক খাতে প্রতি ইউনিট পানির দাম ২৬ টাকা।

'পানিচোর' ধরতে অভিযানের ঘোষণা : ওয়াসার একাধিক বোর্ড সভার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে গড়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানি অপচয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নানাভাবে পানি চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ দাবি করেন, ২৫ থেকে ২৬ শতাংশ পানি অপচয় হচ্ছে। 'পানিচোর' ধরতে শিগগির কোমর বেঁধে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, 'পানি চুরি হচ্ছে- এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও সত্য যে, ওয়াসার পানি সরবরাহের পাইপ লাইনগুলো অনেক পুরোনো। এ কারণেও লিকেজ হয়ে পানির অপচয় হচ্ছে। যাই হোক, পানির অপচয় যে কোনো মূল্যে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।