মেয়রের নেওয়া ‘ঘুষের টাকা’ ফেরত পেতে আমরণ অনশনে মা-মেয়ে

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০   

মেহেরপুর প্রতিনিধি

অনশনরত মা ও মেয়ে -সমকাল

অনশনরত মা ও মেয়ে -সমকাল

মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভায় চাকরি পেতে দেওয়া ১৫ লাখ টাকা ফেরতের দাবিতে আবারো অমরণ অনশনে বসেছেন শহরের শিশির পাড়ার সেই মা ও মেয়ে। মঙ্গলবার সকাল থেকে গাংনী উপজেলা পরিষদ শহীদ মিনার চত্বরে অনশনে বসেছেন তারা।

গাংনী পৌর এলকার শিশিরপাড়া গ্রামের শাহাবুদ্দিন ওরফে বাহাদুরের মেয়ে ও মোমিনের স্ত্রী মৌমিতা খাতুন পলি জানান, গাংনী পৌরসভায় সহকারী কর আদায়কারী পদে নিয়োগের জন্য পৌর মেয়র আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। জামি-জমা বন্ধক রেখে, ধারদেনাসহ বিভিন্ন এনজিও মানুষের কাছে চড়া সুদে টাকা নিয়ে মেয়রকে দেওয়া হয়েছে। মেয়রের নির্দেশে গত ২০১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংক মেহেরপুর শাখায় মেয়র আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী জেলা পরিষদ সদস্য সাহানা ইসলাম শান্তনার ৬৪৫৪ নম্বর (হিসাবে) একাউন্টে ৫ লাখ ৭০ হাজার, ২৫ জানুয়ারি ৫০ হাজার, ৫ ফেব্রুয়ারি ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়। বাকি টাকা নগদে দেওয়া হয়। 

তিনি বলেন, টাকা নিয়ে ২০১৮ সালের ১৯ মে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও আমাকে নিয়োগ না দিয়ে অন্য একজনকে সহকারী কর আদায়কারী পদে নিয়োগ দেন মেয়র আশরাফুল। আমাকে নিয়োগ না দেওয়ায় টাকা ফেরত চেয়ে বারবার তাগাদা দিলেও কোন কর্নপাত না করে মারধর ও হুমকি দিয়ে পৌরসভা থেকে বের করে দেন তিনি। তাই বাধ্য হয়ে বিচার চেয়ে ও টাকা ফেরতের দাবিতে গত ২০ আগস্ট বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গাংনী শহীদ মিনারে অনশন করি। পরে গাংনী থারার ওসি বিচারের আশ্বাস দিলে বাড়ি ফিরে যাই।

মৌমিতা খাতুন পলি জানান, বিষয়টি নিয়ে গত ২১ আগস্ট রাতে গাংনী থানা চত্তরে পৌর মেয়র আশরাফুর ইসলামের উপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক, গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওবাইদুর রহমান, গাংনী থানার সেকেন্ড অফিসার আহসান হাবিব, এসআই আব্দুল হান্নান, সাবেক এমপি মো. মকবুল হোসেনের একান্ত সহকারী সাহিদুজ্জামান শিপু, পৌর কাউন্সিলর মিজানুর রহমান, সাহিদুল ইসলাম, এনামুল হক, শ্রমিক নেতা মনিরুজ্জামান মনি, মৌমিতা খাতুন পলির মা-বাবাসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পলির স্বামীকে নিয়ে বসে তাদের মধ্যে টাকা লেনদেনের বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে সকলে উদ্যোগী হবেন বলে আশ্বস্ত করা হয়।

তিনি বলেন, মেয়র টাকা ফেরত না দেওয়ায় প্রথম দফা অনশন, তারপর সালিশ বৈঠক হলো। এর পরেও কোন কুল কিনারা না পেয়ে আজ থেকে আবার অনশন শুরু করলাম। আমার গর্ভে সন্তান আছে। টাকা না দেওয়ায় এখন আমার স্বামী আমাকে নিতে চাচ্ছেন না। একমাত্র মৃত্যুই এর সমাধান। আমি আর উঠছি না। আমি ও আমার অনাগত সন্তান মারা গেলে আমাদের লাশ বাড়ি যাবে।

এ বিষয়ে মেয়র বলেন, মৌমিতা খাতুন পলির বাবা শাহাবুদ্দিন ওরফে বাহুদুর আমার অত্যন্ত আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি। তার বাড়ির সামনে আমার ৪০ শতাংশ জমি আছে। ওই জমির ৫ কাঠা বিক্রি করার জন্য দামাদামি করি। পরে ৫ কাঠা জমির মূল্য নির্ধারন করা হয় ১৫ লাখ টাকা। জমি বিক্রি করার জন্য মৌমিতা খাতুন পলির স্বামী মোমিন আমাকে টাকা দিয়েছিলেন, চাকরির জন্য নয়। যেহেতু পলির স্বামী মোমিন আমাকে টাকা দিয়েছিলেন, তাই তাকে ফেরত দিয়েছি। 

তবে কাউন্সিলর সাহিদুল ইসলাম বলেন, মেয়র চাকরির জন্য টাকা নিয়েছেন, যা পৌর পরিষদের অনেকেই জানেন। চাকরির নাম করে অসহায় মানুষের কাছ থেকে এভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়া চরম অন্যায় কাজ। 

এদিকে মেয়র আশরাফুল ইসলাম পলির স্বামী মোমিনকে টাকা ফেরত দিয়েছেন বলে দাবি করলেও জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ খালেক ও গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওবাইদুর রহমান জানান, মোমিন কোন টাকা ফেরত নেননি বলে তাদের জানিয়েছেন। মেয়র আশরাফুল ইসলামকে টাকা ফেরত দেবার প্রমাণ দেখাতে বললে তিনি তা না দেখিয়ে গড়িমসি করছেন।

ওসি জানান, অনশনের বিষটি তিনি জেনেছেন। তিনি বলেন, আমরা স্থানীয় ব্যাক্তি ও মেয়র সাহেবের সঙ্গে বসেছিলাম। বিষয়টি অমিমাংশিত রয়ে গেছে। এ বিষয়ে আদালতের স্মরণাপন্ন হওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখছি না।