এক টিউবওয়েলই ভরসা চার গ্রামের মানুষের

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০   

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা

এক কলস পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নারীদের -সমকাল

এক কলস পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নারীদের -সমকাল

‘পুকুরের পানি নোনতা আর ঘোলা, কোনোভাবেই তা খাওয়া যায় না। প্রতি কলস পানি দশ টাকায় কিনে খাবার মত সামর্থ্যও আমাদের নেই। বাধ্য হয়ে দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে এসেছি টিউবওয়েলের পানি নিতে।’

আক্ষেপভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দেওল গ্রাম থেকে শংকরকাঠি গ্রামে পানি নিতে আসা গৃহবধূ হাফিজা বেগম।

পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ‘সিরিয়ালে’র জন্য অপেক্ষমান খুটিকাটা গ্রামের রোজিনা খাতুন জানান, সকাল থেকে গভীর রাত অবধি চার গ্রামের মানুষ লাইন দিয়ে পানি নেয়। একটা মাত্র টিউবওয়েল হওয়ায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরি হয়। পানি আনতে গিয়ে গৃহস্থলী কাজ করার সুযোগ থাকে না।

তিনি আরও বলেন, ‘বড় লোকেরা পানি কিনে খাচ্ছে, কিন্তু আমাগো মত গরিব মানুষগো ভরসা এই টিউবওয়েল।’

পানি সংগ্রহে আসা অসংখ্য নারী, মুষ্টিমেয় শিশুসহ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত দুরবর্তী কাছিহারানী, দেওল, কাটালবাড়িয়া ও খুটিকাটা গ্রাম থেকে এসেছেন তারা। নিজেদের গ্রামে পুকুরের পানি ঘোলা ও লবনাক্ত হওয়ায় তা পুরোপুরি পানের অযোগ্য। আর্সেনিক ও আয়রন থাকার পাশাপাশি টিউবওয়েলর পানিও লবনাক্ত। যে কারণে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করে দুরবর্তী শংকরকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ‘বদনের ভাগাড়’ এলাকার টিউবওয়েলে পানি নিতে আসেন। 

শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়নের কাছিহারানী, কাঠালবাড়িয়া, দেওল ও খুটিকাটা গ্রাম ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, আইলার পর থেকে মূলত এসব এলাকায় খাবার পানির সঙ্কট দেখা দেয়। পরবর্তীতে পানির কষ্ট দুর করতে বেসরকারি উদ্যোগে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হলেও নানা কারণে কয়েক বছর আগেই তা বন্ধ হয়ে গেছে। যার ফলে উপকূলীয় এলাকা না হওযা সত্ত্বেও উপজেলার এ অংশে খাবার পানি নিয়ে রীতিমত হা-পিত্যেশ চলছে।

এদিকে সম্প্রতি সমবায় ভিত্তিতে দেওল ও শংকরকাটি গ্রামে গড়ে তোলা দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে খাবার পানি যোগানের ব্যবস্থা চালু হলেও বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নেয়া হয়। ফলে খেটে খাওয়া আর দিনমজুর শ্রেণির পাশাপাশি সাধারণ পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন খাবার পানি কিনে খাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নিতান্ত বাধ্য হয়ে তাই খাবার উপযোগী একটু পানির জন্য আরও অনেকের মত এসব গ্রামের শত শত মানুষ প্রতিদিন ভিড় জমায় শংকরকাঠি গ্রামে।

শারমীন আক্তার ও সুষমা মন্ডল নামের কাছিহারানী গ্রামের দুই গৃহবধূ জানান, নিজেদের গ্রামের পুকুরের পানি ব্যবহার অনুপযোগী। টিউবওয়েলগুলোর পানিও লবণাক্ত। উপায়ান্তর না থাকায় শংকরকাঠি থেকে পানি সংগ্রহ করলেও তাতে স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা মাথায় নিয়েও ওই পানি পান করতে হয়।

‘কলসের নিচে থাকা অনেকটা পানি ফেলে দিতি হয়’, উল্লেখ করে শারমীন আক্তার বলেন, শংকরকাঠি থেকে পানি এনে তা একদিন রেখে পরের দিন খেতে হয়। এছাড়া সব সময় কলসের নিচের প্রায় এক জগ পানি আয়রনের কারণে ফেলে দিতে হয়। 

শংকরকাঠি গ্রামের বদনের ভাগাড় এলাকার টিউবওয়েল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত রবিউল ইসলাম ও শারমীন আক্তার বলেন, পেটের অসুখ আর দুর-দুরন্তের কথা বিচেনায় না নিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ শংকরকাঠি থেকে পানি সংগ্রহ করে। স্থানীয় জনপ্রতিনিদের কাছ বারবার ধর্না দিয়েও এসব এলাকার খাবার পানি সমস্যার কোন প্রতিকার মেলেনি। 

কাশিমাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ জানান, গোটা উপজেলাজুড়ে খাবার পানির সঙ্কট। আইলার পর থেকে মিষ্টি পানির উৎস সংকুচিত হয়ে গেছে। পানি সমস্যার সমাধানে টিউবওয়েল কার্যকর হচ্ছে না। সেখানে একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে চার গ্রামের মানুষের পানির সমস্যা দূর করা সম্ভব।

উপজেলা সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শংকরকাঠিসহ পাশের এলাকাগুলোতে খাবার পানির তীব্র সঙ্কট রয়েছে। তবে তার দপ্তর থেকে সেখানে সরাসরি কোন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কিছু প্লাস্টিকের ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা সেগুলো যথাযথভাবে বিতরণ করলে পানি সমস্যা কিছুটা কমার সম্ভবনা রয়েছে।