বিপন্ন পর্যটন নগরী: ১

আগ্রাসী ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত কক্সবাজার সৈকত

বিলীন হচ্ছে নয়নাভিরাম ঝাউবন

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজুল ইসলাম আবেদ ও আবু তাহের কক্সবাজার থেকে ফিরে

সৈকতে ভাঙনের ছোবল -সমকাল

সৈকতে ভাঙনের ছোবল -সমকাল

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও সাগরসৈকতে বড় বড় স্থাপনা নির্মাণের ফলে ভাঙনের মুখে পড়েছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। আগ্রাসী ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি। এরই মাঝে কক্সবাজার সৈকতের দৃষ্টিনন্দন ঝাউবনের বিশাল অংশ হারিয়ে গেছে। গত ১৫ দিনে পূর্ণিমার জোয়ারের পানিতে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে ঝাউবনের অন্তত এক হাজার গাছ। হারিয়ে গেছে লাবনী পয়েন্টের ওয়াচ টাওয়ার (পর্যবেক্ষণ টাওয়ার), হিমছড়িতে জেলা পরিষদের রেস্টহাউসসহ কয়েকটি স্থাপনা। এলাকাবাসী ও পরিবেশবিদরা মনে করছেন, ১০-১২ বছর ধরে ভাঙন চলে এলেও সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় এখন তা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বুধবার সকাল ১১টার দিকে কক্সবাজার সৈকতের বালিকা মাদ্রাসা ও ডায়াবেটিক পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারে সাগরের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে উত্তাল ঢেউ আকারে তীরে আছড়ে পড়ছে। এতে ভেঙে যাচ্ছে সৈকতের ব্যাপক এলাকা। স্থানীয় লোকজন জানান, গত এক মাসে সৈকতের লাবনী পয়েন্ট থেকে উত্তর নুনিয়াছড়া ও নাজিরারটেক পর্যন্ত এলাকার অনেক জায়গা পানিতে তলিয়ে গেছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, সাগরের গ্রাস থেকে সৈকতের দৃষ্টিনন্দন ঝাউবাগান কিছুতেই রক্ষা করা যাচ্ছে না। এই বর্ষা মৌসুমে লাবনী পয়েন্ট থেকে নাজিরারটেক অংশে প্রায় ৫০ হেক্টর ঝাউবাগান উপড়ে পড়েছে। সৈকতের সমিতিপাড়া, ডায়াবেটিক হাসপাতাল ও বালিকা মাদ্রাসা পয়েন্টে ভাঙন সবচেয়ে বেশি। বন বিভাগ শ্রমিক নিয়োগ করে এই ঝাউগাছ সরিয়ে নিচ্ছে বলে তিনি জানান।

কবিতা চত্বরে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল বন বিভাগের কর্মী আবদুল জলিলের সঙ্গে। দলেবলে তারা তখন উপড়ে পড়া ঝাউগাছ সরাতে ব্যস্ত। কাজের ফাঁকে নাজিরারটেকের এই বাসিন্দা জানান, ২০ বছর ধরে তিনি বন বিভাগে কাজ করছেন। চার বছর ধরেই ঝাউবন কিছু কিছু ভাঙছে; কিন্তু এবার ভাঙন আগের চেয়ে তীব্র।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, কক্সবাজার সৈকতে ৬৯০ হেক্টর ঝাউবাগান করা হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭৩ সালে। দৃষ্টিনন্দন এই ঝাউবন স্থানীয়দের জন্য যেমন সুরক্ষা প্রাচীর, তেমনি পর্যটকের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। তিন বছর ধরে সাগরের আগ্রাসনে অর্ধেক ঝাউবন সমুদ্রে তলিয়ে গেছে। অথচ এই ঝাউবন রক্ষায় কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। পুরোনো ঝাউবনের বিশাল সব বৃক্ষ রক্ষায় কোনো উদ্যোগ না থাকলেও বন বিভাগ এ বছর নতুন করে ৬০ হাজার ঝাউগাছ রোপণ করবে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সমিতিপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, গত বছর বর্ষা মৌসুমের সময় জোয়ারে সৈকতের নয়নাভিরাম ঝাউবনের প্রায় পাঁচ হাজার গাছ সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে অব্যাহত ভাঙনে দৃষ্টিনন্দন এই ঝাউবনের এখন এক-তৃতীয়াংশ মাত্র অবশিষ্ট রয়েছে। এগুলোও আগামী বর্ষায় রক্ষা হবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

কলাতলী এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মফিজুর রহমান জানান, কক্সবাজার সৈকতের ঝাউবন শুধু সৌন্দর্য রক্ষা করছে না; এই ঝাউবন শহর রক্ষার কাজও করছে। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের সময় সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল সৈকতের এই ঝাউবন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে সাগরের ভাঙনের হার দেখে লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

সৈকত এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী নুরুল আবছার জানান, সৈকতের তীর ঘেঁষে গড়ে তোলা হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, হ্যাচারি, বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনার মালিকরা সমুদ্রের ভয়ংকর রূপ দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তারা উদ্বিগ্ন তাদের বিনিয়োগ নিয়ে। প্রায় পাঁচশ কোটি টাকা বিনিয়োগে সৈকতের তীরজুড়ে স্থাপিত ৫৮টি হ্যাচারি শিল্প নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে কয়েকটি হ্যাচারি এরই মধ্যে নিজ খরচে পাথরের বাঁধ দিয়েছে। তাতেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। তিনি জানান, কলাতলী থেকে হিমছড়ি ও প্যাঁচারদ্বীপ পর্যন্ত এলাকায় মেরিন ড্রাইভ রোড চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

কক্সবাজার শহরকে সাগরের ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য চার বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জমা দিলেও সেটি এখন হিমাগারে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, গত বছরের জুন মাসে প্রকল্পটি একনেক থেকে সংশ্নিষ্ট দপ্তরে ফেরত পাঠানো হয়।

স্থানীয় লোকজন জানান, সৈকতে ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড গত বছর এবং এ বছর জিও ব্যাগ দিয়ে জরুরি কিছু মেরামত কাজ করেছে। তবে অব্যাহত ভাঙনে এই মেরামত ও সংস্কার কোনো কাজে আসছে না। তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, কক্সবাজার সৈকতের ঝাউবন রক্ষায় গত বছর দুই কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এক হাজার ২০০ মিটার অংশে জিওব্যাগ দিয়ে প্রতিরক্ষা বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। এ বছরও প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৪০ মিটার অংশ জিও ব্যাগের বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ৬৪০ মিটার ক্ষতিগ্রস্ত অংশের জন্য ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

তিনি বলেন, এই বর্ষায় হঠাৎ প্রবল জোয়ারে সৈকতের কবিতা চত্বর থেকে ডায়াবেটিক পয়েন্ট এবং লাবনী পয়েন্টের তীর তলিয়ে যাচ্ছে। এই অংশে নতুন করে ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৩০ মিটার অংশ জিও ব্যাগের ডাবল লেয়ার ব্যবহার করে সংস্কার করা হয়েছে।

ভাঙনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়াকেই এ জন্য দায়ী মনে করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এখন জোয়ারের পানি অনেক উপরে উঠে আসছে এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী ঢেউ সাগরকূলে আছড়ে পড়ছে।

শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে আগের প্রকল্পের চেয়ে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও পর্যটনবান্ধব একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছে। সেখানে তারা সমুদ্রতীরে মারাত্মক ক্ষয় ও ভাঙন পর্যবেক্ষণ করেছেন। নতুন এই প্রকল্প একই সঙ্গে শহর রক্ষা বাঁধেরও কাজ করবে। পর্যটকদের সাগর দেখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কলাতলী থেকে নাজিরারটেক পর্যন্ত এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় থাকছে হাঁটা ও সাইকেলের পথ। সৈকত রক্ষায় দুই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে পাঁচ বছর।

তবে ভাঙনের জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে কারণ মানতে রাজি নন এনভায়রনমেন্ট পিপলের প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ। তিনি বলেন, এ জন্য অনেকাংশে দায়ী সাগর-তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে সাগরসৈকতে বড় বড় হোটেল-মোটেল গড়ে উঠেছে। উপরন্তু নেই পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত নেই কোনো ড্রেন। যেটুকু আছে, সেটাও উপচে পড়ে। ফলে এসব বর্জ্য সরাসরি সাগরে গিয়ে পড়ছে। দূষিত করছে সাগরের পানিকে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের বলেন, সাগরসৈকতে অবৈধ স্থাপনার একটা প্রভাব তো রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিদিন হোটেল-মোটেল জোন থেকে ২০ টন এবং শহর থেকে ২০ টন বর্জ্য সরাসরি সাগরে পড়ছে। এই বর্জ্য সাগরমুখে তলদেশের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে একটা বিপরীত স্রোত তৈরি হয়েছে, যা কলাতলী থেকে নাজিরারটেক পর্যন্ত ভাঙনের অন্যতম কারণ।