বিপন্ন পর্যটন নগরী: ২

পাহাড়ে মাদকের হাতছানি

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজুল ইসলাম আবেদ ও আবু তাহের, কক্সবাজার থেকে

ফেসবুক মনে করিয়ে দিচ্ছে, ঠিক তিন বছর পর আবার আমি উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। মিয়ানমারের রাখাইনে ২০১৭ সালের আগস্টে সহিংস ঘটনার পর মানবিক কারণে সীমানা খুলে দেয় বাংলাদেশ। ২৫ আগস্ট থেকে লাখো নির্যাতিত-নিপীড়িত রোহিঙ্গা এ দেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে। টেকনাফের উখিয়ার সবুজ পাহাড়গুলো হয়ে ওঠে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় দেওয়া হয় এই রোহিঙ্গাদের। সে সময় তাদের চোখে-মুখে ছিল তীব্র আতঙ্ক, ভয় ও অনিশ্চয়তার ছাপ।

আজ তিন বছর পর উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে পশ্চিমের ব্লক সির মাঝি (নেতা)  হামিদ হোসেনের ঘরে বসে কথা বলি তখন তার বা তার সঙ্গী-সাথী কারও মধ্যেই সেই আতঙ্ক বা অনিশ্চয়তা দেখলাম না। মিয়ানমার থেকে সীমানা পার হয়ে আসা কফির প্যাকেট গরম পানিতে নাড়তে নাড়তে হামিদ বলেন, এখানে সমস্যা তেমন নেই। পাশের জি ব্লকে একটা ট্যাবলেট গ্রুপ আছে, ওরা এসে মাঝেমধ্যে ঝামেলা করে, তখন সমস্যা হয়। কক্সবাজারের আঞ্চলিক টানে কথা বললেও তার কথা বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছিল। ট্যাবলেট গ্রুপ মানে ইয়াবা পাচারকারী। সঙ্গী আব্দুল মাজিদের ভাষ্যে, জি ব্লকে মাস্টার মুন্না এর হোতা। তার প্রায় ১০০ জনের একটা গ্রুপ আছে এই কাজে। রাত নামলেই এদের চলাচল বেড়ে যায়। নতুন কাউকে বা অন্য ব্লকের কাউকে দেখলেই মারতে শুরু করে। এ রকম পাঁচ-ছয়টা গ্রুপ আছে পুরো ক্যাম্পে। কেউ ক্যাম্পে থাকে, কেউ কেউ আবার ক্যাম্পের বাইরেও চলে যায়।

ক্যাম্পে থাকা এবং ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসা এই রোহিঙ্গাদের নিয়েই তৈরি হয়েছে শক্তিশালী মাদক চক্র। এদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এ দেশের মাদক কারবারিরা। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পুরো কক্সবাজারে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ৫৪৭ জনের একটি তালিকা তাদের কাছে আছে। তাদের সবাই এলাকা ছাড়া বা পলাতক অনেকেই আছে দেশের বাইরে।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয় গ্রুপ আইএসসিজি। সংস্থার সর্বশেষ হিসাবমতে, ৩৪টি ক্যাম্পে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা হচ্ছে ৯ লাখ ৫ হাজার ৮২২ জন। এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে ১৯৯১ সালে আসা ৩৪ হাজার রোহিঙ্গাও। আগের নিবন্ধন এবং পরের নিবন্ধনে ব্যবধান ২ লাখের বেশি। এই রোহিঙ্গারা কোথায় গেছে, এই হিসাব কারও কাছে নেই। তবে সরকারি-বেসরকারি সব মহলই স্বীকার করেছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার তথ্য।

উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গাদের দেওয়া তথ্যমতে, আশ্রয়কেন্দ্রে নিবন্ধন করেনি এমন রোহিঙ্গার সংখ্যাও লাখের ওপরে। মিয়ানমার থেকে অবস্থাপন্ন যেসব রোহিঙ্গা পরিবার পালিয়ে এসেছে, তারা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়নি। বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তারা অবস্থান করছে। কক্সবাজার শহরের ঘোনারপাড়া, পাহাড়তলী, ঝিলংজা, সদর উপজেলার ঈদগাহ এলাকায় অনেক রোহিঙ্গা পরিবার বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে। ব্যবাসা-বাণিজ্য, চাকরিও করছে এসব রোহিঙ্গা।

কক্সবাজার ফিশারি ঘাটে বোট মালিক সমিতির একটি সূত্র জানিয়েছে, সাগরে মাছ ধরার নৌকায় মাঝিমাল্লাদের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা। কম বেতনের কারণে রোহিঙ্গাদের শ্রমে লাগাচ্ছেন বোট মালিকরা। কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহমদ বলেন, রোহিঙ্গাদের কাজ না দিতে নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অনেক বোট মালিক কম বেতন দিতে পরিচয় গোপন রেখে রোহিঙ্গাদের শ্রমে লাগাচ্ছেন।

কক্সবাজারের সদ্য বিদায়ী পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনও স্বীকার করেন, বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা অবাধে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা মহাসড়কের চেকপোস্ট এড়ানোর জন্য হাঁটা পথ ব্যাবহার করে।

পুলিশ সুপার বলেন, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে রোহিঙ্গারা জড়িত হচ্ছে। মাদক নিয়ে সম্প্রতি যেসব লোকজন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক হচ্ছে, তাদের মধ্যে ৯০ ভাগই রোহিঙ্গা। মাদক ব্যবসায় তাদের টাকা লাগে না। মাদক কারবারি সিন্ডিকেট বিনা টাকায় তাদের হাতে মাদক তুলে দিচ্ছে। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে পারলেই রোহিঙ্গারা পেয়ে যাচ্ছে বিপুল অর্থ।

তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায় বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা কক্সবাজার জেলাকেন্দ্রিক। হুন্ডিসহ সীমান্ত বাণিজ্যের আড়ালে এই অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে।

কক্সবাজার শহরের চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের দক্ষিণ পাশে একটি কলোনিতেই বাস করে শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার। জীবিকার কারণে এই রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে শহরে আশ্রয় নিয়েছে। এসব রোহিঙ্গা পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের সবাই কোনো না কোনো পেশায় নিয়োজিত। শহরে রিকশা চালায় রোহিঙ্গা মুহিবুল্লাহ। তিনি জানান, এখানে রিকশাচালক, অটোরিকশাচালকসহ শ্রমজীবীদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। কেউ পরিবার নিয়ে এখানে থাকেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রেখে এসেছেন। মুহিবুল্লাহ বলেন, ক্যাম্পের বাইরে থাকলেও ত্রাণ নেওয়ার জন্য ঠিক সময়ে তারা ক্যাম্পে হাজির হয়। ত্রাণ নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ে। শহরের লাইট হাউসপাড়া, পাহাড়তলী, ঘোনারপাড়া, সমিতিপাড়া, নাজিরার টেকসহ বিভিন্ন এলাকায় অর্ধলক্ষ রোহিঙ্গার বসবাস। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও স্বীকার করেছেন এই তথ্য।

পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সালাহ উদ্দিন সেতু বলেন, রোহিঙ্গারা কক্সবাজার শহরসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। তারা আমাদের শ্রমবাজার দখল করে নিচ্ছে। মাদক ব্যবসা, চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে।

উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গারা এখন ক্যাম্প ছেড়ে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে বসতি গড়ছে অথবা বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছে। স্থানীয় কিছু লোক এবং আগে আসা রোহিঙ্গারা তাদের সহযোগিতা দিচ্ছে।

অধ্যক্ষ হামিদ বলেন, মিয়ানমার থেকে আগে এসেছে এমন অনেকে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলায় জনপ্রতিনিধি। এই জনপ্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের এখানে স্থায়ী হতে নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছেন। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় বসতি স্থাপন করেছে এমন রোহিঙ্গার সংখ্যা অনেক। তিনি বলেন, প্রশাসনিকভাবে কোনো অভিযান নেই, তাই রোহিঙ্গারা বেপরোয়া। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা মারাত্মক অবনতি হচ্ছে। এখানে জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে। কখনও কখনও রোহিঙ্গাদের হাতে অস্ত্রও দেখা যাচ্ছে। এরা এখন স্থানীয়দের জন্য বিষফোড়া। পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ অবনতির দিকে যাচ্ছে।