বেরিয়ে আসছে আরও বাহিনীর নাম

বেগমগঞ্জে ন্যক্কারজনক ঘটনা

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জাহিদুর রহমান, ঢাকা আনোয়ারুল হায়দার, নোয়াখালী

বেগমগঞ্জের একলাশপুরে বিবস্ত্র করে গৃহবধূকে নির্যাতন ও ভিডিও প্রকাশের পর একে একে বেরিয়ে আসছে নানা বাহিনীর নাম। এতদিন ভয়ে থাকা সাধারণ মানুষ ফুঁসে উঠেছে। সন্ত্রাসী বাহিনীর নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরাও মুখ খুলতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় গ্রেপ্তার এড়াতে এখন লাপাত্তা অনেক বাহিনীর সদস্য। তবে তাদের ধরতে র‌্যাব-পুলিশ তৎপর বলে দাবি করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

গত ৮ অক্টোবর 'বেগমগঞ্জে পাড়ায় পাড়ায় বাহিনী' শিরোনামে সমকালে ২৮টি বাহিনীর নাম ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যসহ অত্যাচার-নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশ হয়। এই সংবাদে পুরো জেলায় চলছে তোলপাড়। একটি উপজেলায় এত বাহিনীর নাম দেখে বিস্মিত হন অনেকে। সমকালে সংবাদ প্রকাশের পর ভুক্তভোগীরা সন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকেন। এতদিন যারা ভীতসন্ত্রস্ত ছিলেন তাদের অনেকেই সমকালে ফোন করে আরও বাহিনীর তথ্য দিতে থাকেন। সমকালের কাছে তারা তুলে ধরেন নানা অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনা। ফেসবুকেও বাহিনীর নাম এবং নির্যাতনের ছবিসহ পোস্ট দিচ্ছেন অনেকে।

গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুরে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে দেলোয়ার বাহিনীর সদস্যরা। ঘটনার ৩২ দিন পর নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে মূল হোতা দেলোয়ারসহ গ্রেপ্তার হয় ১১ জন। তবে দেলোয়ার বাহিনীর অনেক সদস্য এখনও পলাতক। তাদের নাম এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। তারা হলো- ল্যাংড়া সাব্বির, ইয়াবা ডন শাহিন, ছোট সোহেল, মিলন, রহিম, কামাল, হাসিব, আজিম, গুলি আলিম, মোল্লা ইমন, শাহ আলম, সজীব, আসলাম, আলাউদ্দিন, ছোট সাইফুল ও ফেনা শরিফ।

ওই ২৮ বাহিনী ছাড়াও আরও সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেরিয়ে এসেছে। এদের ইন্ধনদাতাদের নাম অকপটে বলছেন সাধারণ মানুষ। তারা চান, এ চক্রের মুখোশ উন্মোচন হোক।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বেগমগঞ্জের আমানউলল্গাহপুর ইউনিয়নে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে তসলিম উদ্দিন ওরফে বিষু ও নিজাম উদ্দিন বাহিনী। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সৌদিফেরত মোহাম্মদ উল্লাহ মেম্বারের ছেলে মাসুদ বাড়িতে এলে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে তসলিম ও নিজাম বাহিনী। এরপর মাসুদ এলাকা ছেড়ে চৌমুহনীর রঞ্জন বিবিতে বসবাস শুরু করেন। এই দুই বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবাসী অধ্যুষিত এই ইউনিয়নে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ করেছেন সাধারণ মানুষ। তসলিম বর্তমানে আমানউল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক ও নিজাম উদ্দিন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে এ বাহিনীকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা খোকনেরও রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। তবে আরিফুর রহমান ও নুরুল হুদা খোকনকে একাধিকবার ফোন করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরে মেসেজ দেওয়ার পরও তারা জবাব দেননি।

এ ছাড়া উপজেলার বাংলাবাজারে রবিন বাহিনী, চর কাশিমপুরে অজি উল্যাহ মেম্বার বাহিনী, পৌর এলাকার করিমপুরে জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছয়ানী ইউনিয়নে সহেল বাহিনী, মিঠু বাহিনী, ১০নং নরোত্তমপুর ইউনিয়নের পশ্চিম নরোত্তমপুরের এক নম্বর ওয়ার্ডে পারভেজ ও ফারুক বাহিনী, বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে রয়েল গ্রুপ, মিরওয়ারিশপুরে নাসির ও রাজু বাহিনী, হাজীপুরে খালেদ ও ফয়েজ বাহিনী এবং এখলাশপুরে হৃদয় বাহিনীর নাম উঠে এসেছে।

মিরওয়ারিশপুরে বাদল বাহিনীর বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ। বাদল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। একই ইউনিয়নে রয়েছে বাহার মেম্বার বাহিনী। বাহার একসময় শিবিরের কর্মী ছিলেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। গোপালপুর ইউনিয়নের তিতাহাজরা গ্রামে শাহজাহান বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। একাধিক মামলার আসামি শাহজাহান বর্তমানে মাদকের মামলায় জেলে থাকলেও তার বাহিনীর কর্মকাণ্ড থেমে নেই।

এ ছাড়া আলাইয়ারপুর ইউনিয়নের আমিনবাজার এলাকার সাহাবউদ্দিন ও রমনীরহাটা এলাকার শাকিল গ্রুপ বেশ সক্রিয়। একসময় ছাত্রদল করা শাকিলের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে হামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সর্বশেষ মোটরসাইকেল চুরির মামলায় জেল থেকে বেরিয়ে আবার অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে বেগমগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নূর হোসেন মাসুদের বিরুদ্ধে কয়েকটি বাহিনী ও মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'এখন শুধু আওয়ামী লীগের বাহিনীদের নাম আসছে। কিন্তু বেগমঞ্জে জামায়াত-বিএনপিরও বাহিনী আছে। কোনো বাহিনীর সঙ্গে আমি নেই। তিনি বলেন, এক সময় আমি সবার কাছে ভালো ছিলাম। উপেজলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর অনেকেই আমার পেছনে লেগেছে। দায়িত্ব পালনের সময় স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অনেকের সঙ্গে মতের অমিল রয়েছে। এসব কারণে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন।'

এদিকে একলাশপুরে বর্বর ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেও উপজেলার গোপালপুরে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক প্রবাসীর স্ত্রীর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই নারী ৯৯৯-এ কল দিলে সাদ্দাম বাহিনীর তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হচ্ছে- ফরহাদ হোসেন, ডিজে পারভেজ ও নেছার উদ্দিন দুখু।

র‌্যাব-১১-এর লক্ষ্মীপুর ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবু সালেহ সমকালকে বলেন, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের ধরতে বেগমগঞ্জের সর্বত্র টহল চলছে। তবে অনেকেই এখন গা-ঢাকা দিয়েছে। র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানান, দেলোয়ার গ্যাং চক্রের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছোট বাহিনী হোক আর বড় বাহিনী হোক, কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর স্থান হবে না। আমরা মাঠে কাজ করছি। এসব বাহিনীর যতগুলো সদস্য আছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।