অনুমতিপত্র সাত লাখ টনের, এসেছে মাত্র ৬ হাজার টন

ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ১ মাস

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের এক মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল বুধবার। বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আনতে গত এক মাসে ৬০০ ব্যবসায়ী প্রায় সাত লাখ টনের অনুমতিপত্র নিয়েছেন। বাস্তবে পেঁয়াজ এসেছে ৬ হাজার টন! এটি অনুমতিপত্র নেওয়া পেঁয়াজের দশমিক ৯ শতাংশ। সর্বশেষ গতকাল ও আগের দিন মঙ্গলবার দুটি জাহাজে করে এক হাজার ৬৭ টন পেঁয়াজ এসেছে। এগুলো এখন খালাসের অপেক্ষায় আছে। এদিকে বিকল্প যে ১২ দেশ থেকে পেঁয়াজ
আনার অনুমতিপত্র নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি আছে এশিয়াতে। এখান থেকে পেঁয়াজ আসতে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ৩০ দিন লাগার কথা। ইউরোপ থেকে পেঁয়াজ আনতেও এক-দেড় মাসের বেশি লাগার কথা নয়। গত এক মাসে পেঁয়াজ এসেছে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। এ জন্য বাড়তি দামেই স্থির হয়ে আছে পেঁয়াজের বাজার। পাইকারি মোকামেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে। খুচরা বাজারে যেতে কেজিতে আরও ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাচ্ছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানি হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করে ভারত। বাজার দ্রুত স্বাভাবিক করতে এরপর পেঁয়াজ আমদানির ওপর নির্ধারিত ৫ শতাংশ শুল্ক্কের পুরোটাই প্রত্যাহার করে নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। তারপরও বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানিতে নেই কাঙ্ক্ষিত গতি। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, 'পেঁয়াজের চাহিদা ও মজুদের তথ্য ভালোভাবে না জেনে অনেকে অনুমতিপত্র নিয়েছেন। যারা অনুমতিপত্র নিয়েছেন, তাদের অনেকে আবার এলসি খুলতে সময় নিয়েছেন। এতে বাজারে নির্ধারিত সময়ে আসছে না পেঁয়াজ।' আগামী এক মাসে এ আমদানিতে গতি বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।
অনুমতিপত্র খোলার পরও অনেকে এলসি খোলেননি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. আসাদুজ্জামান বুলবুল। তিনি বলেন, 'অনুমতিপত্র যারা নেন, তাদের সবাই সময়মতো এলসি খোলেন না। যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেওয়া হয়েছে, তার অনেকই এখনও এলসি খোলেনি। এ জন্য আমদানির পরিমাণ অনেক কম। তবে আগামী মাসে এটি বাড়বে বলে আশা করছি।'
পেঁয়াজের নতুন বাজার ধরতে মাঠে নেমেছেন ছয়শ ব্যবসায়ী। এ তালিকায় বড় শিল্পগ্রুপের পাশাপাশি আছেন মৌসুমি ছোট ব্যবসায়ীরাও। ভারতের বিকল্প দেশ থেকে ছয় লাখ টন পেঁয়াজ আনতে কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তর থেকে এরই মধ্যে অনুমতিপত্র নিয়েছেন এসব ব্যবসায়ী। রপ্তানি বন্ধের আগে থেকেই এবার অনুমতির জন্য আবেদন করতে থাকেন তারা। অধিদপ্তর বলছে, এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি আগে কখনও দেননি তারা। পেঁয়াজের জন্য ভারতের বিকল্প দেশ হিসেবে ব্যবসায়ীরা গতবার নজর দিয়েছিলেন মিয়ানমার, পাকিস্তান, চীন, তুরস্ক ও মিসরের দিকে। তবে এবার শুরু থেকেই নেদারল্যান্ডস ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো থেকে পেঁয়াজ আমদানির ঋণপত্র খুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
এস আলম গ্রুপ সর্বোচ্চ ২২ হাজার টন পেঁয়াজ আনার অনুমতিপত্র নিয়েছে। ঋণপত্র খুলে পেঁয়াজ আনার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে তারা গত মাসে। এখনও বন্দরে আসেনি তাদের পেঁয়াজ। এস আলম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক কাজী সালাহউদ্দিন আহাম্মদ বলেন, 'নেদারল্যান্ডস থেকে এবার পেঁয়াজ আনব আমরা। শিগগির আসবে এ পেঁয়াজ। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে এলসি খুলব আরও ৮০ হাজার টনের।'
এখন পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পৌনে দুই লাখ টন পেঁয়াজের ছাড়পত্র ইস্যু করেছে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র। নিউজিল্যান্ড, চীন, মিসর, তুরস্ক, মিয়ানমার, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউক্রেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ভারত ও পাকিস্তান- এ ১২ দেশ থেকে এসব পেঁয়াজ আনছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে মিসর থেকে ২৪ হাজার ৮৩৯ টন, চীন থেকে ১৭ হাজার ৩৬৫, মিয়ানমার থেকে ১৯ হাজার ৯৫১, পাকিস্তান থেকে ১৯ হাজার ৯৮৯, তুরস্ক থেকে আট হাজার ৯২৬, নেদারল্যান্ডস থেকে ২৫ হাজার ৯৩৬, নিউজিল্যান্ড থেকে দুই হাজার ৬২০, মালয়েশিয়া থেকে ২৭০ টন পেঁয়াজ আমদানি করার আবেদন করেছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু যে হারে আবেদন করেছেন, সেই হারে হচ্ছে না আমদানি।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, 'পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে না বাড়লেও বাড়তি দামে স্থির হয়ে আছে এবার। গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ পেঁয়াজ আমদানির চেষ্টা করছেন অনেকে। যেই হারে আগ্রহ দেখানো হয়েছে, সেই হারে আমদানি হচ্ছে না পেঁয়াজ। আসলে দেশের চাহিদা বুঝে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পেঁয়াজ আমদানির চেষ্টা করা উচিত। অনুমতিপত্র নিয়েও যারা পেঁয়াজ আনার এলসি খুলছেন না, তাদেরও রাখা উচিত নজরদারিতে।'