এক রাতেই পরিবারের সবাইকে হারানো শিশুটির দায়িত্ব নিলেন ডিসি

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২০   

কলারোয়া (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি

 ডিসি এসএম মোস্তফা কামালের কোলে শিশু মারিয়া -সমকাল

ডিসি এসএম মোস্তফা কামালের কোলে শিশু মারিয়া -সমকাল

হাজারো মানুষের ভিড়ে মা-বাবার মায়া মমতা আর নির্ভরতার পরশ খুঁজে ফিরছে সদ্য এতিম হওয়া সাতক্ষীরার কলারোয়ার ৫ মাসের শিশু মারিয়া। সবাই জানলেও সে জানে না বা বোঝে না এই জীবনে আর কখনো পাবে না মা-বাবার আদরমাখা স্নেহের পরশ। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবা ও ভাই-বোনহারা অবুঝ শিশু মারিয়া সুলতানার দায়িত্ব নিয়েছেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল। 

শিশু মারিয়া সুলতানাকে হেলাতলা ইউপির ৪, ৫ ও ৬নং সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য নাসিমা খাতুনের জিম্মায় রেখেছেন ডিসি। এখন থেকে তার চিকিৎসা এবং জীবন গড়ার যাবতীয় দায়িত্ব জেলা প্রশাসক গ্রহণ করেছেন বলে বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘোষণা দেন।

জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, কলারোয়ায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারের জীবিত একমাত্র কন্যাশিশুর দায়িত্ব নিয়ে আপাতত দেখাশোনার জন্য স্থানীয় মহিলা ইউপি সদস্য নাসিমা খাতুনের কাছে রাখা হয়েছে। তাকে সাময়িকভাবে দেখভাল করতে অনুরোধ করা হয়েছে। পরবর্তীতে অভিভাবকরা দাবি করলে আইনানুগভাবে সমাধান করা হবে। 

এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী জেরীন কান্তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) আক্তার হোসেন শিশু মারিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিশু খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী নিয়ে হাজির হন ইউপি সদস্য নাসিমা খাতুনের বাড়িতে। সেখানে কিছু সময় অবস্থান করে ইউএনও মৌসুমী জেরীন কান্তা বুকে তুলে নেন সবহারা এতিম শিশু মারিয়াকে। 

ইউপি সদস্য নাছিমা খাতুন বলেন, জেলা প্রশাসকের অনুরোধে এতিম শিশুটিকে দেখাশুনা করছি। আগামীতেও দেখব বলে সম্মতি দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, শিশুটি বর্তমানে ভালো আছে। কান্নাকাটি করছে না।  

এদিকে তালা-কলারোয়ার সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ কলারোয়ার এমন বর্বর হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ঢাকা থেকে ছুটে আসেন নিহতদের বাড়িতে। তিনি এ সময় সদ্য এতিম হওয়া শিশুটির খোঁজ খবর নেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এর আগে বুধবার গভীর রাতে কলারোয়া উপজেলায় খলসি গ্রামে ঘরে ঢুকে শাহিনুর রহমান-সাবিনা খাতুন দম্পতি ও তাদের ছেলে সিয়াম হোসেন মাহি (১০) এবং মেয়ে তাসনিমকে (৮) গলা কেটে হত্যা করে দুবৃর্ত্তরা। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে নিহতদের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

ঘটনার সময় মা সাবিনা খাতুন ও বাবা শাহিনুর রহমানের পাশে ঘুমিয়ে ছিল তাদের ছোট মেয়ে মারিয়া খাতুন।

নিহত শাহিনুরের ছোট ভাই রায়হানুল ইসলাম জানান, তার বড় ভাই তিন ছেলে মেয়ে থাকেন। বুধবার রাতে মা ছিলেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। আর তিনি নিজে (রায়হানুল) ছিলেন পাশের বাড়িতে, তার ঘরে।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে বড় ভাইয়ের ঘর থেকে তার মেয়ে মারিয়ার কাঁন্নার শব্দ শুনতে পান। অনেকক্ষণ ধরে  শিশুটি কান্না করতে থাকায় তিনি ঘরের সামনে গিয়ে ভাইকে ডাকতে থাকেন। কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে বারান্দার গেটের সামনে দিয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখতে পান ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকানো। পরে গেটের তালা ভেঙ্গে ঘরের দরজা খুলে দেখেন ভেতরে ভাই-ভাবির নিথর দেহ পড়ে আছে। অন্য ঘরের দরজা খুলে ভাইপো সিয়াম ও ভাইজি তাসনিমের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পাঁচ মাসের শিশু মারিয়া তখন কাঁদছিল।

রায়হানুল আরও জানান, তাদের সঙ্গে জমা-জমি নিয়ে পাশের কিছু লোকের বিরোধ রয়েছে। কিন্তু কারা এ ঘটনা ঘটালো তা তিনি জানেন না।

কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) হারান পাল জানান, নিজের ঘরের মধ্যে শাহিনুর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে শাহিনুরের পা বাঁধা ছিল এবং তাদের চিলেকোঠার দরজা খোলা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে- ছাদের চিলেকোঠার দরজা দিয়ে হত্যাকারীরা ঘরে প্রবেশ করে। ঘটনার রহস্য উন্মোচনে পুলিশ কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিনি।