চট্টগ্রামে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে মামলা

আসামি নয়, নিহতদের দোষের তদন্ত!

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের চন্দনাইশের আজাদুল ইসলাম আজাদ সাত বছর বাহরাইনে ছিলেন। মাস তিনেক আগে দেশে ফেরেন। এর কিছুদিন পর ১৩ জুলাই তিনি 'নিখোঁজ' হন। দু'দিন পর ১৫ জুলাই তার বড় ভাই আমানুল হক ফারুককে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় চন্দনাইশ থানার পুলিশ। ওই দিন সন্ধ্যায় ফারুককে টেকনাফ থানায় হন্তান্তর করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মাথায় তাদের মায়ের কাছে ফোন করে অজ্ঞাতপরিচয় একজন বলেন, 'তোর দুই ছেলে আমাদের কাছে আছে। দুই ছেলেকে জীবিত ফেরত চাইলে রাতের মধ্যে আমাদের আট লাখ টাকা দিতে হবে। না হলে সকালে ছেলের লাশ পাবি।' এ কথা বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরদিন ১৬ জুলাই সকাল ৮টার দিকে টেকনাফ থানা থেকে তাদের মায়ের নম্বরে ফোন করে জানানো হয়, দুই ভাই আজাদ ও ফারুক টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় টেকনাফের আলোচিত ওসি প্রদীপসহ পুলিশের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন আজাদ-ফারুকের বোন রিনাত সুলতানা শাহীন। চট্টগ্রামের মুখ্য বিচারিক হাকিম মামলাটি গ্রহণ করে জেলা পুলিশের এএসপিকে (আনোয়ারা সার্কেল) তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। তার তদন্তে মেলেনি কোনো প্রশ্নেরই উত্তর। অভিযোগ উঠেছে, অপহরণ ও খুনের অভিযোগ তদন্তের চেয়ে তিনি ভিকটিমদের অপরাধের খতিয়ান তদন্তে বেশি মনোযোগী ছিলেন। কৌশলে মামলা শেষ করে নিজের পেশার লোকদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে প্রবাসী আজাদকে কে বা কারা অপহরণ করে তা উঠে আসেনি। চন্দনাইশ থেকে প্রবাসী অপহরণের পর কীভাবে টেকনাফ থানা পুলিশের হাতে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন, তারও কোনো উত্তর নেই। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে বলেছেন, অপহরণ ও হত্যার অভিযোগের ঘটনাটি চট্টগ্রাম জেলার বাইরে হওয়ায় বিষয়টি তদন্ত করা সম্ভব হয়নি।
বিশিষ্ট আইনজীবী ও সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক আকতার কবির চৌধুরী বলেন, চরম দায়সারা একটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। কারণ আদালত নির্দেশ দেওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা বাংলাদেশের যে কোনো জায়গায় গিয়ে ওই মামলার সংশ্নিষ্ট যে কোনো বিষয়ে তদন্ত করার এখতিয়ার রয়েছে। তিনি হয় জেনেশুনে এ বিষয়টায় এড়িয়ে গেছেন, অথবা নিজের পেশার অভিযুক্তদের কৌশলে বাঁচানোর জন্য এ কাজটি করেছেন।
তিনি বলেন, বাদীর আনা প্রবাসীকে অপহরণের পর চাঁদা না পেয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগের তদন্ত না করে ভিকটিম দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অতীতে কয়টি মামলা ছিল- সেই অপরাধের খতিয়ান প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
তবে চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মো. মফিজ উদ্দিনের ভাষ্য, 'তদন্ত করে যা পেয়েছি, তা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি। বাদী চাঁদা দাবির হুমকি দেওয়া ফোন নম্বর আমাকে দিতে পারেননি। তাই বিষয়টি তদন্ত করা সম্ভব হয়নি। কারও প্রতি পক্ষপাত নয়, নিরপেক্ষভাবেই সিআর মামলাটির তদন্ত করা হয়েছে। সঠিকভাবেই তদন্ত করা হয়েছে। এখানে কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়নি।'
মামলার বাদী রিনাত সুলতানা শাহীন বলেন, 'আমার ভাই আজাদ সাত বছর বাহরাইনে প্রবাসী ছিলেন। খুন হওয়ার কিছুদিন আগে দেশে আসেন। তিনি আসার পর আট লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে প্রথমে গুম করে, পরে টাকা না পেয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে খুন করেন ওসি প্রদীপ। আমার ভাইয়েরা ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিল না। পরিকল্পিত হত্যাকাে র সঠিক বিচার চাই।'
শাহীনের করা মামলায় আসামিরা হলেন- টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, টেকনাফ থানার এসআই ইফতেখারুল ইসলাম, কনস্টেবল মাজহারুল, দ্বীন ইসলাম ও আমজাদ।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে যা আছে :দুই ভাইকে বন্দুকযুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনার পর আদালত মামলাটি তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়ার পর তদন্তে নামে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মো. মফিজ উদ্দিন উল্লেখ করেন, আজাদুল ইসলাম আজাদকে অপহরণ ও চাঁদা দাবি করার বিষয়ে চন্দনাইশ থানায় কোনো প্রকার মামলা কিংবা জিডি করেননি বাদী। এ ছাড়া সিআর মামলায় উল্লিখিত অন্যান্য ঘটনার এই সার্কেলের অধীন তথ্য জেলার বাইরে হওয়ায় তদন্ত করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ জানায়, ভিকটিম আমানুল হক ফারুকের বিরুদ্ধে নগরীর হালিশহর থানায় দুটি, সদরঘাট থানায় একটি ও ডবলমুরিং থানায় একটি করে মোট চারটি মাদক মামলা রয়েছে। বাদীর অন্য ভাই আজাদুল ইসলাম আজাদের বিরুদ্ধে পুলিশের খাতায় কোনো মামলার রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাদীর ভাই আজাদকে কোন জায়গা থেকে কে বা কারা অপহরণ করেছে, সে ব্যাপারে বাদী ও তার স্বজনরা চন্দনাইশ থানায় কোনো মামলা কিংবা জিডি করেননি। বাদীর অন্য ভাই ফারুককে টেকনাফ থানা পুলিশ চন্দনাইশ থানা পুলিশের সহযোগিতায় গ্রেপ্তার করে চন্দনাইশ থেকে টেকনাফ নিয়ে যায়। বাদীর বা বাদীর মায়ের মোবাইলে কোন নম্বর থেকে আট লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে, সেই ফোন নম্বর সুনির্দিষ্টভাবে পুলিশকে দিতে পারেননি তারা।
এসব তথ্য তুলে ধরে অপহরণ ও খুনের অভিযোগের মামলার তদন্ত শেষ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন, দুই পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে ভিকটিম আজাদকে অপহরণ ও খুনের অভিযোগের তদন্তের চেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ভিকটিমদের অপরাধের খতিয়ানের তদন্তে বেশি মনোযোগী ছিলেন।
তিনি বলেন, 'তদন্ত কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন আজাদের নামে মামলার রেকর্ড নেই। তাহলে কে তাকে চন্দনাইশ থেকে তুলে নিয়ে গেল? পরে ওসি প্রদীপের হাতে বন্দুকযুদ্ধে কীভাবে খুন হলো? তার বিষয়ে একটি শব্দও প্রতিবেদনে তুলে ধরেননি। যার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, সেই আজাদকে কেন বন্দুকযুদ্ধে মরতে হলো- সেটিরই বিচার চাইছি আমরা।'
র‌্যাবকে দিয়ে তদন্ত চান বাদী :পুলিশের তদন্ত রিপোর্টকে চরম দায়সারা ও পক্ষপাতমূলক উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে মামলাটির অধিকতর তদন্ত চান বাদী রিনাত সুলতানা শাহীন। আদালতে তিনি নারাজি আবেদন জমা দিয়েছেন। র‌্যাবকে দিয়ে তিনি অধিকতর তদন্ত দাবি করেছেন।