রাজবাড়ীতে ব্যক্তি উদ্যোগ

পুকুরে স্বপ্নের মুক্তা

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সৌমিত্র শীল চন্দন, রাজবাড়ী

রাজবাড়ীতে ঝিনুকের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মুক্তা-সমকাল

রাজবাড়ীতে ঝিনুকের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মুক্তা-সমকাল

সেই সুদূর অতীত থেকে মানুষের কত মুগ্ধতা মুক্তাকে ঘিরে! তিনি নিজেও অনুরক্ত ধৈর্য ও উদারতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই রত্নের। শখের বশে তাই এর চাষ শুরু করেছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন আভিজাত্য ছড়ানো এই রত্নটির চাষবাস করে সবাইকে চমকে দিতে। নিজের বাড়ির পুকুরে তাই মাছের পাশাপাশি এই মুক্তা চাষও শুরু করেছিলেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের কালিচরণপুর গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সাজ্জাদুর রহমান তারেক।

তবে সেই শখ থেকেই পল্লবিত হয়েছে সাজ্জাদুর রহমানের আরও কত স্বপ্ন! এখন তিনি পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে নেমেছেন মুক্তা চাষে। মুক্তা উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষি ও মৎস্য ক্ষেত্রে বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি।

২০০৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন সাজ্জাদুর রহমান তারেক। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন তিনি। রসায়ন বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন ফরিদপুর রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এমবিএ করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনে। ল্যান্স করপোরাল হিসেবে কর্মরত তারেক ২০১৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। দেড় বছর আগে নিজেদের এক একর আয়তনের পুকুরে মাছের পাশাপাশি শুরু করেন মুক্তা চাষ।

সাজ্জাদুর রহমান তারেক জানান, তাদের গ্রামে অনেক পুকুর। মৎস্যগ্রাম হিসেবে বেশ পরিচিত। গার্মেন্ট ও কনজুমার ব্যবসার সুবাদে প্রায়ই ভারতে যাতায়াত করতে হয় তাকে। ভারতের এক বন্ধুর পরামর্শে দেড় বছর আগে তিনি শখের মুক্তা চাষে উৎসাহিত হন। তখন রংপুর, নীলফামারী ও কুয়াকাটা গিয়ে মুক্তাচাষিদের কাছ থেকে এ সম্পর্কে ধারণা নেন। পরে ভারতের মুক্তা গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মুক্তা চাষ বিষয়ে প্রশিক্ষণও নেন। দেড় বছর আগে বাড়ির পাশে নিজের পুকুরে মাছের পাশাপাশি মুক্তা চাষের অনুশীলন শুরু করলেও ছয় মাস আগে মাঠে নেমেছেন সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকভাবে। রাজবাড়ী জেলায় তিনিই প্রথম মুক্তা চাষ শুরু করেছেন বলে দাবি করেন।

তিনি জানান, এই মিঠা পানিতে তিনি সাত হাজার ঝিনুকের মধ্যে ১৪ হাজার মুক্তা চাষ করছেন। একেকটি মুক্তার জন্য প্রয়োজন হয় একেকটি নিউক্লিয়াস, যা ভারত থেকে কেনা হয়। এই নিউক্লিয়াস ইনজেকশনের মাধ্যমে ঝিনুকের মধ্যে ইনজেক্ট করা হয়।

পুকুরে মুক্তা চাষ প্রকল্পের সাইনবোর্ড। পাশে উদ্যোক্তা সাজ্জাদুর রহমান তারেক- সমকাল

ইনজেক্ট করা ঝিনুক একটি কক্ষে সাত থেকে ১০ দিন পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। ঝিনুকগুলো বাঁচিয়ে রাখতে দিতে হয় বিশেষ ওষুধ। তার পরও কিছু ঝিনুক মরে যায়। বেঁচে থাকা ঝিনুকগুলো জালের মধ্যে ঢুকিয়ে বোতল দিয়ে বেঁধে পুকুরে ফেলা হয়। যাতে ঝিনুক মাটিতে না পড়ে যায়। এভাবে এক বছর রাখার পর ঝিনুকের মধ্যে পরিপূর্ণতা পায় মুক্তা।

তারেক বলেন, প্রতিটি ঝিনুকের জন্য খরচ হয় ১০০ টাকা। যেহেতু গ্রোথ ভালো হচ্ছে, এজন্য তিনি ঝিনুক থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই মুক্তা সংগ্রহ করার আশা রাখেন। প্রতিটি মুক্তা কমপক্ষে ১৫০ টাকা করে বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

ঝিনুক সাধারণত শীতকালে পাওয়া যায়। তবে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকায় তারেক এক লাখ ঝিনুক সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করছেন। মুক্তা চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাড়তি কোনো খরচ ও ঝুঁকি নেই। মাছের দেওয়া খাবার খেয়েই বেঁচে থাকে ঝিনুক। বর্ষায় পুকুর ভেসে গিয়ে মাছের ক্ষতি হতে পারে; কিন্তু ঝিনুক ভেসে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

সাজ্জাদুর রহমান তারেক জানান, মুক্তা চাষকে প্রসারিত করার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে তার। এর মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থান হবে, বেকারত্ব দূর হবে। মুক্তা জাপানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি করা যায়। বাংলাদেশ ও ভারতে মুক্তার সুন্দর ডিজাইন হয়। বিদেশে এর প্রচুর চাহিদাও রয়েছে। তিনি জানান, আপাতত তার সঙ্গে একজন কাজ করছেন। তবে বড় আকারে চাষাবাদ করতে গেলে প্রচুর শ্রম দিতে হবে। আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারিতে এর ফল পাওয়া যাবে। জেলা মৎস্য অফিস থেকে এ ব্যাপারে তাকে সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। মুক্তা চাষে জেলার অন্য কেউ এগিয়ে এলে তিনিও তাদের সহযোগিতা করবেন।

তারেকের চাচা আমিনুর রহমান জানান, মুক্তা চাষের পেছনে তারেক প্রচুর শ্রম দিচ্ছে। তার স্বপ্ন সফল হলে রাজবাড়ী জেলার মানুষের উপকার হবে। অন্যরা মুক্তা চাষে এগিয়ে আসবে। বেকারত্ব দূর হবে।

রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, রাজবাড়ী জেলায় সাজ্জাদুর রহমান তারেকই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মুক্তা চাষ করছেন। জেলা মৎস্য অফিস থেকে আগ্রহী যে কাউকে এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।