শজিমেক চিকিৎসকের কাছে জিম্মি অনেক পরিবার

সরকারি প্রকল্পে জমি বিক্রি

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মোহন আখন্দ, বগুড়া

আব্দুল বাতেন

আব্দুল বাতেন

সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে জমি বিক্রির মাধ্যমে পকেট ভারি করতে বগুড়ায় আব্দুল বাতেন নামে সরকারি এক চিকিৎসক শহরের মালগ্রাম এলাকার জায়গা ও বাড়ির মালিকদের জিম্মি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজারদরের চেয়ে তিনগুণ বেশি দামে সরকারের কাছে জমি বিক্রির সুযোগ কাজে লাগাতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ওই চিকিৎসক। অবসরপ্রাপ্ত এক সেনাসদস্যসহ অনেকের বসতবাড়ি ও জায়গা কেনা দেখিয়ে দখলে নিতে প্রাণনাশের হুমকি দিতেও দ্বিধা করছেন না তিনি। এসব ঘটনায় ডা. বাতেনের বিরুদ্ধে একাধিক জিডি হয়েছে।
শুধু সাধারণ মানুষই নয়, ডা. বাতেন ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কর্মকর্তাদেরও ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত জমিতে স্থাপনা তুলে তিনি বাড়তি ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করতে চেয়েছিলেন। তবে তার সেই স্থাপনাকে জনস্বার্থবিরোধী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে পরে উচ্ছেদ করা হয়।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডা. বাতেন এমন অনেক জমির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন, যেগুলো ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি ইস্যু করা ৪ ধারা নোটিশের (অধিগ্রহণের প্রস্তাব) পর কেনা বলে প্রমাণ রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী ওই তারিখের পর কোনো ক্রেতা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন না। তারপরও তিনি ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে অনেক ব্যক্তিকে দিয়ে তদবির করারও চেষ্টা করছেন।
জায়গাজমি নিয়ে একজন সরকারি চিকিৎসকের এমন তৎপরতাকে লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। ডা. বাতেনের কারণে প্রকৃত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে জানিয়ে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধও জানিয়েছেন।
সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শহরের মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল থেকে শজিমেক হাসপাতাল পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য মালগ্রাম মৌজায় ৪ একরের কিছু বেশি জায়গা অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্প গ্রহণের পর থেকেই ডা. বাতেন নিজে, স্ত্রীসহ স্বজনদের নামে জায়গা কেনা শুরু করেন। রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য, শুধু মালগ্রাম মৌজাতেই তাদের নামে প্রায় দেড় একর জমি কেনা হয়েছে। আর ওই সড়কের জন্য মালগ্রাম মৌজায় যে ৬৯টি দাগের জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, তার ১৪টিই (ভিন্ন ভিন্ন স্থানে) নিজেদের বলে দাবি করেছেন ডা. বাতেন ও তার স্বজনরা।
অন্যের জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগে ডা. বাতেনের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত সদর থানায় দুটি জিডি ও একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। মালগ্রাম এলাকার মনোয়ারা বেগম নামে এক নারী ২০১৯ সালের ১১ জুন দায়ের করা জিডিতে অভিযোগ করেন, উচ্চ আদালতে মামলায় স্থগিতাদেশ রয়েছে- এমন জমিও ডা. বাতেন দখলের চেষ্টা করছেন এবং ভয়-ভীতি দেখাচ্ছেন। ওই এলাকার আলী হাসান কামাল নামে অপর এক ব্যক্তি তার সীমানাপ্রাচীর ভাঙার অভিযোগে চলতি বছরের ১৭ মার্চ ডা. বাতেনের বিরুদ্ধে সদর থানায় অভিযোগ করেন। সর্বশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর ডা. বাতেনের বিরুদ্ধে আরও একটি জিডি করেন মালগ্রাম এলাকার আফজাল হোসেন। জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন, তার জায়গায় তিন সহযোগীকে নিয়ে ডা. বাতেন স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে তিনি বাধা দেন। এতে ডা. বাতেন তাকে প্রাণাশের হুমকি দেন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে গেলে শফিকুল ইসলাম সুলতান নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তার টিনশেডের বাড়িসহ জায়গাটি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে তাকে পরপর চারটি নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণের টাকা গ্রহণের জন্য ডিসি অফিসে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন, তার বসতবাড়ির ওই জায়গাটি ডা. বাতেন নিজের বলে দাবি করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য শফিউল আলম জানান, তার পাকা ভবনসহ পুরো বাড়ির জায়গা সড়কের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পাকা ভবনের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৮ লাখ টাকা তিনি উত্তোলনও করেছেন। কিন্তু যখন বাড়ির জায়গার ক্ষতিপূরণ নিতে গেছেন তখন জানতে পারেন ওই জায়গাটি ডা. বাতেন নিজের বলে দাবি করেছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বলেন, 'আমি নিজে মালগ্রাম এলাকায় গিয়েছি এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথাও বলেছি। ডা. বাতেনের কারণে অনেক ভূমি মালিক তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এগুলো প্রশাসনের দেখা উচিত।'
বগুড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান জানান, অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত জায়গায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ডা. বাতেন একটি স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। তবে সেটি ক্ষতিপূরণের জন্য প্রাপ্য না হওয়ায় উচ্ছেদ করা হয়। ডা. বাতেনের বিরুদ্ধে জায়গাজমি সংক্রান্ত একাধিক জিডির বিষয়ে বগুড়ায় পুলিশের মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, আমরা যখনই অভিযোগ পেয়েছি তখনই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি।
অন্যের জায়গাজমি ও বসতবাড়িকে কেন নিজের বলে দাবি করছেন- এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল ডা. আব্দুল বাতেনের কাছে। তিনি সমকালের কাছে দাবি করেন, সম্পত্তিগুলো মালগ্রাম এলাকার মছির খন্দকার নামে এক ব্যক্তির। তিন মেয়ে ছাড়া তার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। সে সুযোগে অনেকে ভুয়া নামজারি করে ভোগদখল করে আসছে। যেহেতু তাদের সঙ্গে (মছির খন্দকারের মেয়ে ও নাতি) আমার একটা ভালো সম্পর্ক, তাই তাদের পক্ষ হয়ে মধ্যস্থতা করতে গেছি। অন্যের সম্পত্তি দখল-সংক্রান্ত একাধিক জিডির বিষয়ে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার নাম উল্লেখ করে বলেন, তার মাধ্যমে একজনের সঙ্গে এরই মধ্যে আপস হয়েছে। অন্যগুলোও আপস হয়ে যাবে।
বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল মালেক জানান, ডা. আব্দুল বাতেনকে বৈধ মালিক হিসেবে এরই মধ্যে তিনটি দাগে জমির ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক কোটি ৩১ লাখ টাকারও বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। আরও বেশ কয়েকটি দাগের মালিক হিসেবে তিনি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন- যেগুলো ৪ ধারা নোটিশের পর কেনা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে এগুলো নিয়ে শুনানি চলছে। আব্দুল মালেক বলেন, ডা. বাতেন অনেক বড় বড় জায়গা থেকে তার দাবিগুলো প্রতিষ্ঠিত করানোর চেষ্টা করছেন। তবে আমরা নিয়মের বাইরে যেতে পারি না এবং যাবও না।