৯১৭ জাহাজে ভাসছে ২২ লাখ টন পণ্য

১১ দফা দাবিতে ধর্মঘট চলছে, আজ জরুরি বৈঠক

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘটে আটকেপড়া দেশের ৩৮টি ঘাটে দু'দিন ধরে ভাসছে ৮৭৪ জাহাজ। এসব জাহাজে চাল, ডাল, গমসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় ১২ লাখ টন পণ্য রয়েছে। বন্দরের বহির্নোঙরেও পণ্য নিয়ে আটকা পড়েছে ৪৩টি বড় বিদেশি জাহাজ। শিল্পের কাঁচামালসহ এসব জাহাজে আছে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য। টানা দু'দিনের ধর্মঘট নৌ বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি করেছে। অচলাবস্থা তৈরি করছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের বহির্নোঙরেও। নৌযান মালিকরা শ্রমিকদের এমন আকস্মিক ধর্মঘটকে অযৌক্তিক বলছেন। অন্যদিকে নৌযান শ্রমিকরা বলছেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারা। দু'পক্ষের এমন অনড় অবস্থানে ক্রমে জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি। বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ ৪৩টি বিদেশি জাহাজকে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা করে। দু'দিনেই এসব জাহাজের ক্ষতি ছাড়িয়ে গেছে ছয় কোটি টাকা। একইভাবে ক্ষতি গুনতে হচ্ছে বিভিন্ন ঘাটে আটকেপড়া ৮৭৪ জাহাজকেও। ক্ষতির এই পরিমাণ ক্রমে বাড়তে থাকায় জরুরি বৈঠক ডেকেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আজ বৃহস্পতিবার সব পক্ষকে বৈঠকে ডেকেছে তারা।
চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) বন্দরের বহির্নোঙরে থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করে। ভোগ্যপণ্য ছাড়াও নদীপথে পরিবাহিত সিমেন্ট ও ইস্পাতের কাঁচামাল পরিবহন করা হয়। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সরঞ্জামও নৌপথে পরিবহন করা হয় সারাদেশে। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে এখন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে পুরো নৌ সেক্টরে। সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে এরই মধ্যে নৌ মন্ত্রণালয়কে তাগাদা দিয়েছে চিটাগং চেম্বার অব কমার্স। এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, 'নৌপথে অচলাবস্থা তৈরি হলে সেটির প্রভাব খুব সুদূরপ্রসারী হয়। বন্দরের বহির্নোঙরে যে অর্ধশত জাহাজ প্রতিদিন ১৫ লাখ টাকা করে লোকসান গুনছে, তা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই আদায় করবে তারা। বিভিন্ন ঘাটে দুই দিন ধরে আটকেপড়া সহস্রাধিক জাহাজের ক্ষতিও গুনতে হবে আমাদের। যেসব কারণে এমন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা উচিত নৌ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের। অন্যথায় অচলাবস্থা তৈরি হবে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরেও।'
লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব রশিদ জানান, কর্মবিরতির কারণে দেশের ৩৮টি ঘাটে তাদের অধীনে থাকা ৮৭৪ লাইটার জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন পণ্যের খালাস কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পণ্য নিয়ে এসব জাহাজ বিভিন্ন ঘাটে ভাসছে দু'দিন ধরে। এর বাইরে সিমেন্টের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য পরিবহনের জন্য দেশের ১১টি শিল্প গ্রুপের নিজস্ব লাইটার জাহাজেও পণ্য পরিবহন হয়। প্রসঙ্গত, বন্দরে বড় জাহাজ থেকে নদীপথে সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবহন হয় লাইটার জাহাজ বরাদ্দকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে। নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ১১ দফা দাবি আদায়ে গত সোমবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে লাগাতার ধর্মঘট শুরু করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৪৩টি বড় জাহাজে শস্যদানা, গম, চিনি, ডালজাতীয় খাদ্যপণ্য ছাড়াও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ক্লিঙ্কার, চুনাপাথর ও জিপসাম, পাথর ইত্যাদি পণ্য রয়েছে। নৌপরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে এসব খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করতে পারছেন না তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, 'বন্দর জেটিতে পণ্য খালাস কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে। তাই জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে সংশ্নিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে। আজ বৃহস্পতিবার এ বৈঠক হবে বন্দর ভবনে।'
ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনাকালে এ ধরনের ধর্মঘট অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকারক। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়বে। এ জন্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখা, বন্দরে জাহাজজট নিয়ন্ত্রণে রাখা, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং আমদানি করা ভোগ্যপণ্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারাদেশে পরিবহন স্বাভাবিক করতে জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সোমবার চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার। গতকাল মঙ্গলবারও এ ব্যাপারে তাগাদা দিয়েছে চিটাগাং চেম্বার।
চেম্বারের পক্ষ থেকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। লাইটার জাহাজ চলাচল না করায় সারাদেশে এসব কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বন্দরে জাহাজজট সংকট তৈরি করছে। জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম বৃদ্ধি এবং ওভারস্টের কারণে ডেমারেজ চার্জসহ পণ্য আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সাধারণ ভোক্তাদেরও অতিরিক্ত মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতে হবে।
জাহাজ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কোস্টাল ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) সাধারণ সম্পাদক নূরুল হক বলেন, 'যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়া ধর্মঘট ডাকা অন্যায়। এখন দেশের যে ক্ষতি হচ্ছে সেটির দায়ভার কে নেবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় অচল হয়ে যাবে পুরো নৌ সেক্টর। অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হবে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর।'
জানা গেছে, দেশের ৩৮টি ঘাটে এ মুহূর্তে পণ্য নিয়ে ভাসছে ৮৭৪টি জাহাজ। এসব জাহাজে ডাল, গম, চিনির কাঁচামাল, ভুট্টা, সার, সিমেন্ট ক্লিংকার, পাথর, লাইমস্টোন, ড্যাপসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে প্রায় ১২ লাখ টন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের স্থানীয় নদীতে ৮২টি লাইটারেজ জাহাজে ভাসছে এক লাখ ১৯ হাজার টন পণ্য। এ ছাড়া ৬৭ হাজার টন পণ্য নিয়ে নোয়াপাড়া ঘাটে ৬৫টি, ৩২ হাজার ৬০০ টন পণ্য নিয়ে নগরবাড়ী ঘাটে ৩২টি, সাড়ে ১৭ হাজার টন পণ্য নিয়ে বাঘাবাড়ীতে ১৬টি, এক লাখ ৯৭ হাজার টন পণ্য নিয়ে নারায়ণগঞ্জে ১১৭টি, ২৮ হাজার টন পণ্য নিয়ে ঘোড়াশালে ২৭টি, ৬২ হাজার টন পণ্য নিয়ে মিরপুরে ৫৮টি, সাড়ে ৯ হাজার টন পণ্য নিয়ে বরিশালে ১২টি, সাড়ে ১৪ হাজার টন পণ্য নিয়ে পটুয়াখালীতে ২০টি, ৩৫ হাজার টন পণ্য নিয়ে আশুগঞ্জে ২৮টি, এক লাখ টন পণ্য নিয়ে রূপসী ঘাটে ৬২টি, ৬০ হাজার টন পণ্য নিয়ে কাঁচপুর ঘাটে ৩৮টি, ৭৭ হাজার টন পণ্য নিয়ে মেঘনা ঘাটে ৪৭টি, ২৭ হাজার টন পণ্য নিয়ে পলাশঘাটে ২৪টি, ৫৮ হাজার টন পণ্য নিয়ে ডেমরা ঘাটে ৪৩টি, ২০ হাজার টন পণ্য নিয়ে এস আলম ঘাটে ৪৬টি, ৩৯ হাজার টন পণ্য নিয়ে বাগেরহাটে ৩১টি, ৭৬ হাজার টন পণ্য নিয়ে পূর্বগ্রাম ঘাটে ৫৯টি জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। সব মিলিয়ে ৩৮টি ঘাটে পণ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা এখন ৮৭৪টি। আর পণ্য নেওয়ার অপেক্ষায় সিরিয়ালে আছে ৩৭৬টি জাহাজ। এ হিসেবে অলস বসে থাকা জাহাজের সংখ্যা মোট ১২৫০টি।
চিনির কাঁচামাল, গম, ডাল, পাথর, লাইমস্টোন, ড্যাপ, ইউরিয়াসহ বিভিন্ন পণ্য নিতে ৪০টি লাইটার জাহাজ অপেক্ষায় বসে আছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ঘাটে। নারায়ণগঞ্জ, আলীগঞ্জ, পাগলা, মিরপুর এবং কাঁচপুর ঘাটে কাদামাটি, গম, ভুট্টা, লাইমস্টোন, পাথরবোঝাই করতে শতাধিক লাইটার আছে অপেক্ষায়। একইভাবে নগরবাড়ী এবং বাঘাবাড়ীতে ভাসছে ২০টি লাইটারেজ জাহাজ। নোয়াপাড়া, ফরিদপুরের সিঅ্যান্ডবি, খুলনার মোংলা ঘাটে গম, ভুট্টা, পাথর, ইউরিয়ার চন্য অপেক্ষায় আছে ১০টি জাহাজ। পণ্য ওঠানামা বন্ধ থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছে এসব জাহাজ।
তবে এমন ক্ষতির জন্য কোনো দায় নিতে রাজি নন নৌযান শ্রমিকরা। নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম বলেন, 'দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের। বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করছে না মালিকরা। যৌক্তিক দাবি পূরণ না হলে এবার আর ধর্মঘট প্রত্যহার করব না।'