চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা

কমিটি ভেঙে দিয়ে 'বিপদে' বিএনপি

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক জেলা চট্টগ্রাম দক্ষিণে দলটির এখন হযবরল অবস্থা। জেলার আওতাধীন উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি ছাড়াই চলছে বিএনপি। দল পুনর্গঠন করতে এক বছর আগে একসঙ্গে সব কমিটি ভেঙে দিয়েছিল জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। নতুন কমিটি না হওয়ায় মাঠ পর্যায়ের দলটির কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা চরম ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট। তারা এ ব্যাপারে হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি বহুধাবিভক্ত। কোন্দলে জড়িত নেতারা কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না। নেতাদের দলাদলিতে দলটির নাস্তানাবুদ অবস্থা। এ অবস্থায় গত বছরের ২ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ানকে জেলার দল গোছানোর দায়িত্ব দিয়েছিল হাইকমান্ড। তিন মাসের মধ্যে দল গোছানোর সময় বেঁধে দিয়ে ৬৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছিল তাকে। দায়িত্ব নিয়েই আবু সুফিয়ান ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর এক সভায় জেলার আওতাধীন সাতটি উপজেলা, পাঁচটি পৌরসভাসহ সব পর্যায়ের কমিটি বাতিল করে দেন। এরপর থেকে এসব ইউনিটে এক বছর ধরে কোনো কমিটি নেই। যেখানেই নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেখানেই দলাদলিতে আটকে যাচ্ছে কার্যক্রম। যে কোনো মূল্যে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সিনিয়র নেতারা তাদের পছন্দের লোকদের দেখতে চান। এটাই নতুন কমিটি গঠন ও দল পুনর্গঠনে প্রধান বাধা।

দল গোছাতে যার হাতে নেতৃত্বভার দেওয়া হয়েছে, সেই আবু সুফিয়ান মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি পদে থাকায় নগরীর রাজনীতিতে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। আবার গত নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে দলের হয়ে নির্বাচন করেন তিনি। ফলে এই আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয়। এ ছাড়া নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়টি তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে জেলা বিএনপিকে পুনর্গঠন করতে সেখানে সব মনোযোগ দেওয়া তার পক্ষে কঠিন বলে মনে করেন অনেক নেতাকর্মী।

বোয়ালখালী উপজেলার ভেঙে দেওয়া কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান মুরাদ মামুন আক্ষেপ করে সমকালকে বলেন, 'দল পুনর্গঠন ও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে মহানগরের একজন বিএনপি নেতাকে নিয়ে এসে জেলা কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সেই কমিটি দায়িত্ব নিয়েই উপজেলা, পৌরসভাসহ অন্যান্য কমিটি ভেঙে দিয়েছে। তিন মাসের মধ্যে কমিটিগুলো করে সম্মেলন আয়োজনের কথা ছিল। কিন্তু এক বছরে একটি কমিটিও পুনর্গঠন করা যায়নি। ফলে এই সময় ধরে এখানকার কোনো ইউনিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো নেতা নেই। এতেই বোঝা যায়, বর্তমানে দলের কী অবস্থা।'

জানা যায়, ২০০৯ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকে সভাপতি ও অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ২০১১ সালে ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে রদবদল আনা হয়। শেখ মহিউদ্দিনকে সরিয়ে গাজী শাহজাহান জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে জাফরুল ইসলাম ও শাহজাহান জুয়েলের নেতৃত্বে ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কমিটির মেয়াদ দুই বছর। কিন্তু দীর্ঘ আট বছর দায়িত্ব পালন করে যান তারা। এরপর দলের কার্যক্রমে আরও গতি আনতে গত বছরের ২ অক্টোবর আবু সুফিয়ানকে আহ্বায়ক ও বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোস্তাক আহমদকে সদস্য সচিব করে কেন্দ্র থেকে ৬৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও তারাও সেভাবে দলে গতি আনতে পারেননি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আওতায় যে সাতটি উপজেলা রয়েছে, সেগুলো হলো পটিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী। পাঁচটি পৌরসভা হলো বাঁশখালী, চন্দনাইশ, পটিয়া ও সাতকানিয়া।

মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান সমকালকে বলেন, 'সব ইউনিটে নতুন করে কমিটি গঠন করতে গিয়ে বিপত্তি দেখা দিচ্ছে। বিএনপি বড় দল হিসেবে এমনিতেই নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা রয়েছে। এর সঙ্গে নেতাদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি জড়িয়ে যাওয়ায় নতুন কমিটি গঠনে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তারপরও আমরা দলের সব পক্ষকে নিয়ে, সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দল পুনর্গঠনের কাজ করে যাচ্ছি। আমি নিজেও এ বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।'