নয় মাস আগে চট্টগ্রামের প্রথম চলন্ত সিঁড়ির ফুট ওভারব্রিজ চালু করেছিল সিটি করপোরেশন। চার কোটি টাকা ব্যয়ে নগরের জাকির হোসেন সড়কে নির্মিত এ সেতু এখন বলতে গেলে পরিত্যক্ত। অবস্থা এমন যে, চলন্ত সিঁড়িটি নিয়মিত চালানোও হয় না। আর চালানো হলেও মানুষ তাতে চড়ে না।
গত দুই মাসে অন্তত চার দিন দুই থেকে চার ঘণ্টা অবস্থান করে হাতেগোনা মানুষকে এ চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে এক দিন ফুট ওভারব্রিজটি বন্ধও ছিল। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, 'সেতুটি সঠিক স্থানে নির্মিত না হওয়ায় মানুষের কোনো কাজে আসছে না। সেতুটি যদি বর্তমান অবস্থানের মাত্র ১০০ মিটার দূরে ওয়্যারলেস মোড়ে নির্মাণ করা হতো, তাহলে তা খানিকটা হলেও কাজে লাগত।'
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, 'ফুট ওভারব্রিজটি যেখানে নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে রাস্তা পারাপারের কোনো মানুষ থাকে না। দায়িত্ব নিয়ে কর্মকর্তাদের কাছে সেতুটি ওখানে নির্মাণের কারণ জানতে চেয়েছিলাম। তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সরকারি থোক বরাদ্দের টাকায় এটি নির্মাণ করা হয়েছে। তিনিই সেখানে ফুট ওভারব্রিজটি নির্মাণ করার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন। এখন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ফুট ওভারব্রিজকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিশ্চিত করতে!'
ফুট ওভারব্রিজটির অবস্থান চট্টগ্রাম-১০ আসন এলাকার জাকির হোসেন সড়কের মুরগি ফার্মে। এ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আফছারুল আমীন। এ সেতুটিতে রাস্তার দুই পাশ থেকে চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহার করে ওঠা গেলেও নামার জন্য সাধারণ সিঁড়ি ব্যবহার করতে হয়। আবার চলন্ত সেতুতে উঠতেও পাঁচ ফুট উচ্চতার সিঁড়ি মাড়াতে হয় পথচারীদের। গত ৩০ জানুয়ারি সেতু চালুর দিন জানানো হয়েছিল, এটি সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চালু থাকবে। কিন্তু গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে ১১টা এবং ১৯ সেপ্টেম্বর বেলা ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত চলন্ত সিঁড়িটি বন্ধ দেখা গেছে। সড়ক থেকে সেতুর উচ্চতা ২৫ ফুটের বেশি। অনেক পথচারীই ২৫ ফুট সিঁড়ি মাড়িয়ে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে চান না। এটির রক্ষণাবেক্ষণে সিটি করপোরেশন নিয়োজিত কর্মী থাকার কথা থাকলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। এ সময় ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে কাউকে পার হতেও দেখা যায়নি। অবশ্য চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের কিছু রোগী ও পাশের বিটিআই বহুতল ভবনের বাসিন্দারা মাঝেমধ্যে এটি ব্যবহার করেন বলে জানিয়েছেন সড়কের পাশের এক দোকানি। তিনি বলেন, 'ফুট ওভারব্রিজের পাশের ভবনটির ম্যাডামরা মাঝেমধ্যে এটি ব্যবহার করে বাজার করতে রাস্তার এপাড়ে আসেন। এ ছাড়া সকালের দিকে কিছু পোশাক কর্মীও এটি দিয়ে মাঝেমধ্যে পার হন।'
ডায়াবেটিক হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী মংলা প্রু মারমা বলেন, 'অধিকাংশ রোগীই হাসপাতালে গাড়ি নিয়ে আসেন। কেউ ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করেন না। যারা গাড়ি নিয়ে আসেন না, তারাও উঁচু সিঁড়ি মাড়িয়ে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারে আগ্রহী নন। চলন্ত সিঁড়িটিও দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। দিনে মাত্র ঘণ্টা দেড়েক এটি চালানো হয়।' এ ছাড়া গত ৪ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা অবস্থান করে মাত্র পাঁচজনকে পার হতে দেখা গেছে। এ সময় মাত্র দেড় ঘণ্টা সিঁড়িটি চালু ছিল। গত ১৬ অক্টোবর পুরো দিন চলন্ত সিঁড়িতে ওঠার মুখের গেটটি বন্ধ ছিল। অথচ একই সময়ে মাত্র ১০০ মিটার অদূরে জাকির হোসেন সড়কের ওয়্যারলেস মোড়ে ঝুঁকি নিয়ে পথচারীদের পারাপার হতে দেখা গেছে।
এ প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সালেহ বলেন, 'ফুট ওভারব্রিজটি রক্ষণাবেক্ষণে সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দু'জন কর্মচারীকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।'
তবে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) ঝুলন কুমার দাশ বলেন, 'প্রকৌশল বিভাগ থেকে ফুট ওভারব্রিজটি এখনও কাগজে-কলমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।' প্রকৌশল বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে জানালে তিনি বলেন, 'সব সময় চলন্ত সিঁড়িটি চালু রাখা ব্যয়বহুল। বিদ্যুৎ বিলের বিষয় রয়েছে। তাই পারাপারের জন্য লোকজন না থাকলে এটি বন্ধ রাখা হয়।'
এদিকে ফুট ওভারব্রিজের স্থান নির্বাচনে ভুল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ূয়া বলেন, 'ফুট ওভারব্রিজটি পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়নি। তাই মানুষের কোনো কাজে লাগছে না। সরকারি অর্থ ব্যয়ে সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা জনগণের উপকারের চিন্তা করেন না। তার বড় উদাহরণ এই ফুট ওভারব্রিজ।'
তিনি বলেন, 'কোনো প্রকল্প নেওয়ায় আগে সমীক্ষা করতে হয়। এখানে সে রকম কিছু করা হয়নি। যে কোনো প্রকৌশলসংশ্নিষ্ট কাজই বিজ্ঞান। এটা উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা মানতে চান না। যে কারণে যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু জনগণের কোনো কাজে আসছে না।'


বিষয় : চলার লোক নেই চলন্ত সিঁড়িতে

মন্তব্য করুন