বাড়তি দামে আলু বেচতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অভিনব কৌশল বেছে নিয়েছেন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। আলু কেনাবেচার কোনো ডকুমেন্ট বা রশিদ রাখছেন না তারা কেউ। আলুর দাম নির্ধারণ করে নিচ্ছেন মোবাইল ফোনে। এভাবে 'পেপারলেস ব্ল্যাক মার্কেট' কৌশলে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে বেশি দামে আলু বিক্রির পথ বেছে নিয়েছেন কতিপয় ব্যবসায়ী ও আড়তদার। ফলে অভিযানে গিয়ে কারও কাছ থেকে আলু কেনাবেচার কোনো ডকুমেন্ট না পাওয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রশাসনকে।

এ পরিস্থিতিতে অভিযান চালালেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না আলুর দাম। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার পাইকারিতে ৩০ টাকা ও খুচরায় ৩৫ টাকা কেজি আলুর দর ঠিক করে দিয়েছে। কিন্তু উপেক্ষিত হচ্ছে এ নির্দেশনা।

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পাইকারি রেয়াজউদ্দিন বাজার। এখান থেকে আলু যায় জেলার ১৫ উপজেলাসহ আশপাশের বেশকিছু এলাকায়। প্রধান এই বাজারে ট্রাক ট্রাক আলুর কেনাবেচা হলেও সে সবের কোনো রশিদ বা কোনো প্রমাণপত্র নেই এখানকার কোনো ব্যবসায়ী কিংবা আড়তদারদের কাছে। রেয়াজউদ্দিন বাজারে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকায়- যা খুচরা বাজারে মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। রেয়াজউদ্দিন বাজারের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান পেপারলেস ব্ল্যাক মার্কেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছে- এমন প্রমাণ পেয়েছে প্রশাসন। এদের মধ্যে অন্যতম এই বাজারের আলু বিক্রয়কারী বড় প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা ট্রেডার্স, জননী ট্রেডার্স, কুমিল্লা ট্রেডার্স, কুসুমপুরা বাণিজ্যালয়, মক্কা বাণিজ্যালয়, রফরফ ট্রেডার্স, দাউদকান্দি বাণিজ্যালয়, আশীষ হাওলাদার ট্রেডার্স, শাহাব উদ্দিন ট্রেডার্স ও আবু তৈয়ব ট্রেডার্স। এগুলোর কোনোটিতেই আলু ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো রশিদ পাননি জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এমন প্রেক্ষাপটে এই বাজারসহ চট্টগ্রামের ছোট-বড় অন্য বাজারগুলোতেও পেপারলেস ব্ল্যাক মার্কেটিংয়ে জড়িত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খুঁজে বের করার কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক সমকালকে বলেন, 'চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি রেয়াজউদ্দিন বাজারে অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছে আলু ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো রশিদ পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন উপায়ে এই বাজারে ৪০ থেকে ৪২ টাকায় প্রতি কেজি আলু বিক্রির প্রমাণ পেয়েছি। পেপারলেস ব্ল্যাক মার্কেটিংয়ে জড়িত থাকার প্রমাণও পেয়েছি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এরা রশিদ না রেখে মোবাইল ফোনে নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম ঠিক নির্ধারণ করছে। এ বাজারসহ অন্য বাজারগুলোতেও এমন কারসাজির সঙ্গে যুক্ত সবাইকে চিহ্নিত করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে প্রশাসন।'

রেয়াজউদ্দিন বাজারে ৫০টির বেশি আড়ত রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ, জয়পুরহাট, রংপুর, দিনাজপুরসহ আরও কয়েকটি এলাকা থেকে আলু আসে এই বাজারে। চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের আড়তগুলোতেও সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে আলু বিক্রি হচ্ছে। একই অবস্থা নগরের চকবাজার, বহদ্দারহাট, কাজীর দেউরি, কর্ণফুলী, ফিরিঙ্গী বাজার, বক্সিরহাট, সল্টগোলা বাজার, দেওয়ান বাজারসহ ছোট-বড় সকল খুচরা বাজারে। চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের বেশকিছু প্রতিষ্ঠানও পেপারলেস ব্ল্যাক মার্কেটিংয়ে জড়িত।

রেয়াজউদ্দিন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'রশিদ সংরক্ষণ করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে। তাই এখন কেবল মোবাইল ফোনে কথা বলে আলুর দাম নির্ধারণ করছেন ব্যবসায়ীরা। একসঙ্গে কয়েক বস্তা আলু বেচলেও বিক্রীত পণ্যের কোনো রশিদ নিজেদের কাছে রাখছেন না তারা।'

ক্যাব চট্টগ্রামের বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, 'পর্যাপ্ত আলুর সরবরাহ থাকলেও কারসাজি করে দাম বাড়াচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এ জন্যে তারা পেপারলেস ব্ল্যাক মার্কেট কৌশল বেছে নিয়েছেন। প্রধান কয়েকটি বাজারের অসাধু ব্যবসায়ীরা এর সঙ্গে জড়িত। এদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।'

বহদ্দারহাটে আসা স্কুলশিক্ষক জয়ন্তী চৌধুরী বলেন, 'সরকার খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু ৩৫ টাকা দাম নির্ধারণ করলেও ৪৫ থেকে ৫০ টাকার নিচে আলু কিনতে পারছি না।'

গার্মেন্টস কর্মী লোকমান হোসেন প্রশ্ন করেন, 'এক কেজি আলু কিনতে যদি ৫০ টাকা খরচ হয়, তা হলে চাল-ডালের মতো দরকারি অন্য জিনিসপাতি কিনব কীভাবে?'

খুচরা বিক্রেতা আলী হোসেন বলেন, 'পাইকারি বাজার থেকে ৪০ থেকে ৪২ টাকায় আলু কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ। অনেক আলু আবার নষ্টও পাওয়া যায়। খুচরা পর্যায়ে আমরা বিক্রি করতে পারি দুই-এক টাকা লাভে। দাম বাড়ার পেছনে বড় ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা জড়িত।'