১০ বছর আগে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে রোজগার করতেন মইদুল সানা। সংসারের খরচ মেটাতে এর আগে ভটভটিও (শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ভ্যান) চালিয়েছেন। পরে ইটভাটার শ্রমিক। সেখান থেকেই ভাগ্য বদলিয়ে নিজেই এখন একটি ইটভাটার মালিক হয়েছেন। একই সঙ্গে গড়ে তুলেছেন বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তার প্রতিষ্ঠানেই এখন ৫০ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করছেন। নিজের বুদ্ধিমত্তা, শ্রম আর একাগ্রতায় ভটভটি চালক মইদুল এখন কোটি টাকার সম্পদের মালিক।

মইদুল সানা (৪২) খুলনার কয়রা উপজেলার সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ গ্রামের মৃত মোহর আলী সানার দুই ছেলের মধ্যে ছোট। তার বড় ভাই মইজুদ্দিন সানার পৃথক সংসার। তিনিও একজন সচ্ছল হ্যাচারি পোনা ব্যবসায়ী। মা, দুই ছেলে, এক মেয়ে, স্বামী-স্ত্রীসহ সাত সদস্যের পরিবার মইদুলের। তার পরিবারে সফলতা ও সচ্ছলতা এলাকার মানুষের কাছে এখন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। তার পথ ধরে এলাকার অনেক যুবক এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

তবে মইদুলের ভাগ্যের পরিবর্তন নিমিষেই হয়ে ওঠেনি। নিজের বুদ্ধিমত্তা, সততা আর কর্মদক্ষতাকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে আজ এ অবস্থানে তিনি। এলাকায় গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি, আছে গাড়িও। নিজের পদবিতে উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় গড়ে তুলেছেন সানা ব্রিকস, উপজেলা সদরের তিন রাস্তার মোড়ে সানা ইলেকট্রনিক্স ও সানা ট্রেডার্স। জমি কিনেছেন এলাকায় ও এলাকার বাইরে। বর্তমানে ঠিকাদারি ব্যবসাও করছেন তিনি। লেখাপড়ায় স্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেননি মইদুল। বাবা মারা যাওয়ার পর প্রথমে বড় ভাইয়ের সঙ্গে স্থানীয় ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন। পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল ও ভটভটি চালিয়েছেন। পরে তার বড় ভাই মইজুদ্দিন সানার হাত ধরে ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইটভাটায় শ্রমিক সরবরাহের কাজ শুরু করেন। মৌসুমের আগে ইটভাটা মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা এনে তা এলাকার শ্রমিকদের মধ্যে দাদন দিতেন। মৌসুম শুরু হলে এসব শ্রমিককে বিভিন্ন ইটভাটায় পাঠানো হতো। এভাবে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শ্রমিক সরবরাহ করে প্রায় এক কোটি টাকা সঞ্চয় করেন মইদুল। ওই বছরই সানা ইলেকট্রনিক্স নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। কয়েক বছরের মধ্যে ব্যবসার প্রসার বাড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপও নেন। বর্তমানে সুপারস্টার কোম্পানি ও টাইগার সিমেন্টের কয়রা উপজেলার পরিবেশক তার প্রতিষ্ঠান সানা ট্রেডার্স। সময়ের অভাবে কিছুদিন পর শ্রমিক সরবরাহের কাজ বন্ধ করে দেন তিনি।

প্রতিবেশীরা জানান, মইদুল নিজে বেশি লেখাপড়া না করলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার প্রতি বেশ মনোযোগী। তার তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় ছেলে মুজাহিদ এবার এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে, ছোট ছেলে মুস্তাফিজুর রহমান নবম শ্রেণিতে ও মেয়ে মহসীনা আকতার সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। পাশাপাশি অনেক অসচ্ছল প্রতিবেশীর সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন করেন তিনি। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেন।

মইদুল সানা বলেন, নিজের ব্যবসা দেখাশোনার ফাঁকে যেটুকু সময় পাই মানুষের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করি। অনেক কষ্ট ও পরিশ্রম করে আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। সৎ মানসিকতা নিয়ে শুরু করলে যে কোনো কাজে সফল হওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়ার আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের লাভের একটা অংশ মানবতার সেবায় ব্যয় করতে চাই।

কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর বলেন, স্বল্প শিক্ষিত একজন মানুষ নিজের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হয়েছেন। তার সফলতায় এলাকার অনেক তরুণ-যুবক অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।

বিষয় : অনুপ্রেরণা ভটভটি চালক ব্যবসায়ী খুলনা

মন্তব্য করুন