সিলেটে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে ৩১ ঘণ্টার দুর্ভোগ

নেপথ্যে অনিয়ম-দুর্নীতি

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হাসনাইন ইমতিয়াজ

৩১ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন সিলেট। সবচেয়ে বেশি সংকট ছিল পানির। সুরমা নদী থেকেও পানি সংগ্রহ করতে হয়েছে শহরবাসীকে। বুধবার চাঁদনীঘাট এলাকার ছবি 	- ইউসুফ আলী

৩১ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন সিলেট। সবচেয়ে বেশি সংকট ছিল পানির। সুরমা নদী থেকেও পানি সংগ্রহ করতে হয়েছে শহরবাসীকে। বুধবার চাঁদনীঘাট এলাকার ছবি - ইউসুফ আলী

বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। মঙ্গলবারও সিলেটের একটি গ্রিড উপকেন্দ্র ও বিতরণ ব্যবস্থা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ফলে দীর্ঘ ৩১ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়েছে কয়েক লাখ মানুষকে। জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও নগরীর অধিকাংশ এলাকা ডুবে ছিল অন্ধকারে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের একটি গ্রিড উপকেন্দ্রে দুই দফা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দুটি উপকেন্দ্রই পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) আওতাধীন। ময়মনসিংহের দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের জন্য উপকেন্দ্রে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারকে দায়ী করা হয়। সিলেটের ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি হয়েছে, যাদের সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তবে সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, সিলেটের দুর্ঘটনাও নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণেই ঘটে থাকতে পারে। অন্যান্য সূত্র থেকেও উপকেন্দ্র নির্মাণে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির আভাস মিলেছে।
বিদ্যুৎ খাত-সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন- নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় প্রায়ই অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহককে। বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন গতকাল সমকালকে বলেন, কয়েকটি কারণে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে আগুন লাগতে পারে। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে, উপকেন্দ্র বেশি পুরোনো হলে, সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ না করলে অগ্নিকাণ্ড হতে পারে। তদারকির অভাবেও দুর্ঘটনা ঘটে বলে মন্তব্য করে তিনি জানান, ট্রান্সফরমারগুলোতে যে তেল ব্যবহার করা হয় তার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। তা না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা সংরক্ষণের জন্য পৃথক বাজেট থাকে। সেই অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহে পিজিসিবির উপকেন্দ্রে আগুন লেগে বিভাগের চার জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আগেই ১০ সেপ্টেম্বর একই উপকেন্দ্রে আবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফলে টানা কয়েকদিন বিদ্যুৎহীন থাকেন লাখো গ্রাহক। ওই ঘটনায় পিজিসিবির গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উপকেন্দ্রে মানসম্মত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার আগুনে পুড়ে যাওয়া সিলেটের পিজিসিবির উপকেন্দ্রটির ঠিকাদার ছিল চীনের প্রতিষ্ঠান টিবিইএ। এ প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ২৪ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন ১৮ মাসের মধ্যে নির্মাণ করার কথা থাকলেও তা পাঁচ বছরেও শেষ করতে পারেনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমের মতে, ঠিকাদারদের নিম্নমানের কাজের কারণেই বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গত ১১ এপ্রিল রাজধানীর রামপুরার উলন উপকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এটি পিজিসিবির উপকেন্দ্র হলেও তা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। ওই সময় বিতরণ কোম্পানির একজন প্রকৌশলী জানিয়েছিলেন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই আগুন লেগেছিল। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কেরানীগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের নবনির্মিত একটি উপকেন্দ্রে আগুন লাগে। এটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল সিমেন্স। দুর্ঘটনার পর জানানো হয়েছিল নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহারই অগ্নিকাণ্ডের কারণ। ওই ঘটনায় সিমেন্সকে কালো তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বিদ্যুৎহীন সিলেট :গত মঙ্গলবার সকাল ১১টা ১০ মিনিটে সিলেটের কুমারগাঁও গ্রিড উপকেন্দ্রে আগুন লাগে। পিজিসিবির গ্রিড উপকেন্দ্রের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) উপকেন্দ্র ও বিতরণ ব্যবস্থাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্নিকাণ্ডের ১৭ ঘণ্টার মধ্যে পিজিসিবির উপকেন্দ্র প্রস্তুত হলেও পিডিবির বিতরণ ব্যবস্থা বিদ্যুৎ সরবরাহের উপযোগী হতে সময় নেয় ৩১ ঘণ্টা। এই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায় তিন লাখ গ্রাহক চরম দুর্ভোগে পড়েন। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও অনেক এলাকাই বিদ্যুৎহীন থেকে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় পানিসহ নানা সংকটে পড়েন সিলেটবাসী।
সিলেট ব্যুরো জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নগরবাসীকে পানির জন্য অভাবনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। দিনভর সুরমা নদী ছাড়াও বিভিন্ন উৎস থেকে তারা পানি সংগ্রহ করেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে কার্যক্রম চলে জেনারেটর দিয়ে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেনারেটর কিছু কিছু সময় বন্ধ রাখার ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় রোগী ও চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিতদের।
ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের পাশেই পিডিবির ২২৫ মেগাওয়াট ও ২০ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পিজিসিবির ১৩২ কেভির সঞ্চালন লাইন ও ১৩২/৩৩ উপকেন্দ্র হয়ে পিডিবির বিতরণ লাইনের মাধ্যমে সিলেটে সরবরাহ করা হয়।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পিডিবি-পিজিসিবির :পিজিসিবির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াকুব ইলাহী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) গতকাল সমকালকে জানান, আগুনের সূত্রপাত হয় পিডিবির উপকেন্দ্র থেকে। সেখান থেকে পিজিসিবির উপকেন্দ্রে আগুন লাগে। এই দুর্ঘটনায় তাদের চারটি সাব-স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়। মঙ্গলবার বিকেলেই তিনটি সাব-স্টেশন চালু হয়। চতুর্থটির মেরামত বুধবার ভোরেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু বিতরণ পর্যায়ে বিদ্যুৎ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ায় সরবরাহে বিলম্ব হয়েছে।
এদিকে পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, পিজিসিবির ১৩২ কেভি গ্রিডের আগুনই পিডিবির ৩৩ কেভি বিতরণ লাইনে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিদ্যুতের তারসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশও পুড়ে যায়। ঢাকা থেকে টিম ও যন্ত্রপাতি পাঠিয়ে মেরামতের কাজ করতে হয়। তাই সরবারহ শুরু হতে বিলম্ব ঘটে।
পিডিবির সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোকাম্মেল হোসেন জানান, তাদের অনেক যন্ত্রপাতি ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হয়। ঢাকার একটি টিম এসেছে। দেড়শতাধিক লোক দিনভর কাজ করেছেন। বৃহস্পতিবারের মধ্যে সব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তিনি আরও জানান, দুটি ট্রান্সফরমার মেরামত করা হয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুর থেকে নতুন আরেকটি ট্রান্সফরমার আনা হয়েছে। সেটি বৃহস্পতিবার লাগানো হবে।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তার পরই দুর্ঘটনার কারণ ও ক্ষতি সম্পর্কে জানা যাবে।
দুটি তদন্ত কমিটি গঠন :সিলেটের উপকেন্দ্রে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রহমত উল্লাহ্‌ মো. দস্তগীরকে প্রধান করে এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে পিডিবি, পাওয়ার সেল, পিজিসিবির প্রতিনিধিও রয়েছেন। তদন্ত কমিটির সদস্যরা গতকাল বিকেলে সিলেটে পৌঁছে কাজ শুরু করেন। গতকাল সন্ধ্যায় কমিটির প্রধান মো. দস্তগীর সমকালকে বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে তারা কেবল কাজ শুরু করেছেন। তদন্ত এখনও মন্তব্য করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেনি।
এদিকে পিজিসিবির প্রধান প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে (সঞ্চালন-২) প্রধান করে গঠিত আরেকটি কমিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছে। এই কমিটিতে পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) প্রতিনিধি রয়েছেন। কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত কীভাবে হলো, তা খতিয়ে দেখছেন বলে জানা গেছে।