বিয়ের পর স্বামীকে কথা দিয়েছিলেন- বাঁচলে একসঙ্গে, মরলে একসঙ্গে মরব। যেন সেই প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়নের পথে হাঁটলেন সেতু খাতুন। প্রিয়তমার প্রাণ বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দিয়ে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। 

স্বামীর প্রতি তার এই বিরল ভালোবাসার গল্প এখন মানুষের মুখে মুখে। সেতু খাতুন ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামের রাশিদুল ইসলামের স্ত্রী।

জানা গেছে, গত আগস্ট মাসে প্রথম কিডনি রোগ ধরা পড়ে আনসার সদস্য রাশিদুলের। প্রথমে একটি কিডনিতে সমস্যা দেখা গেলেও পরে তার দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে যায়। ভ্যানচালক বাবার যেটুকু সহায়-সম্বল ছিল, তা বিক্রি করেই চলছিল চিকিৎসা। পরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব আর বিত্তবানদের সহযোগিতায় ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকেন রাশিদুল। আড়াই মাস ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যান তিনি। একপর্যায়ে প্রচণ্ড অর্থ সংকটে বন্ধ হয়ে যায় তার চিকিৎসা। চিকিৎসক জানিয়ে দেন, বেঁচে থাকতে হলে রাশিদুলের অন্তত একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

দরিদ্র আবদুল মালেকের কাছে তা ছিল পাহাড়সম। ফলে ছেলের জীবনের আশা এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন তারা। তবে থেমে যাননি রাশিদুলের স্ত্রী সেতু খাতুন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি নিজের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় স্বামীর রক্তের গ্রুপের সঙ্গে তার গ্রুপ মিলে যায়। এরপর তিনি জেদ ধরেন, স্বামীকে বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দেবেন। অবশেষে শুরু হয় রাশিদুলের দেহে স্ত্রীর কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া।

গত ১২ নভেম্বর ঢাকার সিকেজি ইউরোলজি হাসপাতালে ডা. কামরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেতু খাতুনের একটি কিডনি রাশিদুলের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। বর্তমানে তারা ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই দম্পতি সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন রাশিদুলের বাবা।

এদিকে স্বামীকে কিডনি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ পরিবার, স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ সবার প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন গৃহবধূ সেতু খাতুন। রাশিদুলের বাবা বলেন, অর্থের অভাবে ছেলের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম আর হয়তো ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না। ছেলের বউ কিডনি দিতে চাইলে তাকে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু সে কারও কথা শোনেনি। পুত্র ও পুত্রবধূর জন্য সবার কাছে দোয়া চান তিনি।

সেতু খাতুন বলেন, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা সৃষ্টিকর্তার নিয়ামক। যদি স্বামীই বেঁচে না থাকে তাহলে কী হবে আমার বেঁচে থেকে। যতদিন বাঁচব, স্বামীর ভালোবাসায় বেঁচে থাকতে চাই। স্বামীর জন্য তিনি সবার দোয়া চান।

ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, স্বামীকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দেওয়ার নজির তিনি আগে দেখেননি। এটি স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসার বিরল দৃষ্টান্ত।