ময়মনসিংহ

প্রকল্প শেষ হতে আট দিন বাকি, শুরুই হয়নি কাজ

অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২০     আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ

ছবি: ফাইল

ছবি: ফাইল

অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় শ্রমিক নিয়োগ করে প্রান্তিক এলাকার রাস্তাঘাট মেরামত করা হয়। করোনা দুর্যোগের মধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ প্রকল্পটিকে ঘিরে স্বপ্ন বুনছিলেন। কিন্তু যথাযথ সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়া এবং কাজে নয়ছয় হওয়ায় শ্রমিকরা বঞ্চিত। ৪০ দিনের প্রকল্প কাগজপত্রে শেষ হবে ৩০ নভেম্বর। কিন্তু এখনও কাজ শুরু করতে পারেনি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া, ফুলপুর, গৌরীপুর, মুক্তাগাছা ও নান্দাইল উপজেলায়। শুধু এ পাঁচ উপজেলা নয়, জেলার অন্য উপজেলাগুলোতেও প্রকল্পটির কাজ নিয়ে উদাসীন সংশ্নিষ্টরা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে গত ৫ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে 'অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির' আওতায় প্রথম পর্যায়ের ওয়েজ কস্ট, নন-ওয়েজ কস্ট মজুরি বাবদ বরাদ্দ করা হয়। ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫০৫ কোটি ৯ লাখ ৯ হাজার ৭৮৭ টাকা। ৫৯ হাজার ৭৪১ জন শ্রমিকের বিপরীতে ৪০ দিনের কাজের মজুরি বাবদ বরাদ্দ হয় ওই অর্থ। প্রকল্পের কাজে গত বছরের বন্যা ও চলতি বছরের বন্যা-পরবর্তী রাস্তাঘাট মেরামত ও ভিটি উঁচুকরণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হয়। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির সময়সীমা এবং নির্ধারিত সময়ে অবশ্যই কাজ সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজ সমাপ্ত করার চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়ের বরাদ্দ দেওয়া হবে না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (কাবিখা-৩) মো. আবুল কালাম আজাদ স্বাক্ষরিত পত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

কাগজপত্রে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত কাজ শুরু হয়নি জেলার ধোবাউড়া, ফুলপুর, গৌরীপুর, মুক্তাগাছা ও নান্দাইল উপজেলায়। তবে হালুয়াঘাট ও ত্রিশালে ১ নভেম্বর, তারাকান্দা ও সদর উপজেলায় চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে, ঈশ্বরগঞ্জে ৭ নভেম্বর, ফুলবাড়িয়া ও ভালুকায় ১৪ নভেম্বর, গফরগাঁও উপজেলায় কাজ শুরু হয়েছে ২৪ অক্টোবর। এতে প্রকল্পটির পুরো সময় কাজ না হওয়ায় বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ফেরত যাবে। তবে প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের বরাদ্দ যে সময় হয়েছে, সে সময় কৃষকের মাঠে ধান ছিল। প্রকল্পটির কাজের উৎস কৃষি জমির মাটি। কৃষকের মাঠে ধান থাকায় মাটি না পাওয়ার শঙ্কা ছিল। এ ছাড়া শ্রমিকরা মাত্র ২০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করেন। ২০০ টাকার মধ্যে তারা ১৫০ টাকা পেলেও ৫০ টাকা সঞ্চয় হিসেবে ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে তুলতে পারে টাকা। এ ছাড়া চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার কারণেও মাটির সংকট রয়েছে। শ্রমিক সংকট, মাঠে ধান থাকার সঙ্গে যুক্ত হয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের প্রকল্প তালিকা না দেওয়া। তালিকা জমা দিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন দপ্তর থেকে জনপ্রতিনিধিদের তাগাদা দেওয়া হলেও তালিকা না পাওয়ার অজুহাতে কাজ শুরু হয়নি। এতে সরকারি এ প্রকল্পটির কাজ ভেস্তে যেতে বসেছে।

দুই নম্বর গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, মাঠ পর্যায়ে ঝামেলার কারণে তালিকা প্রস্তুত করতে বিলম্ব হয়েছে। তবে তিনি এখন তালিকা প্রস্তুত করছেন। ধোবাউড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ইশতিয়াক হোসাইন বলেন, কাজ শুরু করার জন্য তালিকা চেয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের কাছে দুই দফা চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে শ্রমিক তালিকা না পাওয়ায় তারা প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারছেন না।

তারাকান্দা ও ফুলপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাকারিয়া আলম বলেন, তারাকান্দা উপজেলায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কাজ শুরু করতে পারলেও ফুলপুরে কাজ শুরু করতে পারেননি। চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে প্রকল্প তালিকা না পাওয়া, মাঠ পর্যায়ে এখনও জমিতে ধান থাকায় কাজ শুরু করা যায়নি।

গৌরীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল রানা পাপ্পু বলেন, প্রকল্প তালিকা না পাওয়ায় এখনও কাজ শুরু করতে পারেননি। সব ইউনিয়নের তালিকা পেলেও একটি ইউনিয়নের তালিকা না পাওয়ায় কাজ শুরু করা যায়নি। তবে এ সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু করা হবে। মুক্তাগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রকিবুল হকও জানালেন একই সমস্যার কথা। চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে প্রকল্প তালিকা না পাওয়ায় শুরু হয়নি কাজ। নান্দাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবদুল আলীম অবশ্য প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা শুনে অবাক হয়ে যান। তিনি বলেন, প্রকল্পটির কাজ শুরুর বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। হালুয়াঘাট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আলাল উদ্দিন বলেন, ৩০ নভেম্বর তাদের প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সপ্তাহে শ্রমিকরা পাঁচ দিন কাজ করে। সে হিসাবে তারা নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটির অর্ধেক সময় কাজ করতে পারবেন। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসান কর্মকর্তা মো. ছানোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, এ বছর প্রকল্প শুরুর সময় স্বচ্ছতার জন্য কাজের স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে অনেকের কাজে অনীহা চলে আসে। চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে প্রকল্প তালিকা না পাওয়ায় সব উপজেলায় প্রকল্পটির কাজ শুরু করা যায়নি। কয়েক দফা তারা তাগাদাও দিয়েছেন। তবে আগামী সপ্তাহ নাগাদ কাজ শুরু হতে পারে। পরে কাজের অগ্রগতি দেখে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখবেন।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মুক্তাগাছা প্রতিনিধি শফিক সরকার, নান্দাইল প্রতিনিধি মজুমদার প্রবাল, ভালুকা প্রতিনিধি এমএ মালেক খান উজ্জল, গফরগাঁও প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল আমিন বিপ্লব, ফুলবাড়িয়া প্রতিনিধি কবীর উদ্দিন সরকার হারুন ও ত্রিশাল প্রতিনিধি মতিউর রহমান সেলিম।