সর্বোচ্চ দরদাতাকে নরসিংদী রেলস্টেশন সংলগ্ন ৯৫ শতাংশ আয়তনের পুকুর ইজারা দিতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সুপারিশ করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। কিন্তু রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) নির্দেশে তা বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়। কী কারণে পুনঃদরপত্র করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা নেই। গত মাসে পুনঃদরপত্রে ইজারা পেয়েছেন নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম হিরুর ভাতিজা মাহফজুল হক ভূঁইয়া শিহাব। যদিও কাগজে-কলমে ইজারা গ্রহীতা উজ্জ্বল বর্মণ। তবে পুকুরপাড়ের সাইনবোর্ডে পুকুরের স্বত্বাধিকারী হিসেবে তার সঙ্গে রয়েছে শিহাব ভূঁইয়ার নাম। মাছ চাষের জন্য ইজারা দেওয়া হলেও পুকুরপাড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে দোকানপাট। শিহাব ভূঁইয়া এ বিষয়ে বলেছেন, উজ্জ্বল বর্মণ তার বন্ধু। দু'জন মিলে ইজারা নিয়েছেন। মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে দোকান তুলে ভাড়া দেবেন।

ইজারা প্রক্রিয়ার নথি পর্যালোচনা করে জানা গেছে, গত বছরের ১৬ জানুয়ারি নরসিংদী স্টেশন সংলগ্ন ৯৫ শতাংশের পুকুরসহ সারাদেশে ৭১টি জলাশয়ে মাছ চাষের লাইসেন্স দিতে দরপত্র আহ্বান করে রেলওয়ে। সাটিরপাড় মৌজার এ পুকুরের পাঁচ বছরের নূ্যনতম ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয় দুই লাখ পাঁচ হাজার ৬২০ টাকা। পূর্বের ইজারাদার মিজানুর রহমান চৌধুরী দুই লাখ আট হাজার টাকা দর দেন। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে তাকে ইজারা দিতে সুপারিশও করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি।

কমিটির আহ্বায়ক এবং রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, পাঁচ সদস্যের কমিটি নরসিংদীর সহ ১৯টি পুকুর সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দিয়ে আর কোনো দরপত্র আহ্বান না করার সিদ্ধান্ত নেয়। অনুমোদনের জন্য তা তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) সৈয়দ ফারুক আহমেদের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয় থেকে নরসিংদীতে পুনঃদরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে কী কারণে পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে হবে, তা বলা হয়নি। সৈয়দ ফারুক আহমেদ সম্প্রতি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। কী কারণে দরপত্র বাতিল করে কম ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে- এ বিষয়ে তার বক্তব্যও জানা যায়নি।

গত ১০ অক্টোবর পুনঃদরপত্রে নূ্যনতম ইজারা মূল্য কমিয়ে দিয়ে তিন বছরের জন্য নির্ধারণ করা হয় ৭১ হাজার ২৫০ টাকা। অর্থাৎ বছরে ২৩ হাজার ৭৫০ টাকা। অথচ আগের দরপত্রে বছরওয়ারি ইজারা মূল্য ছিল ৪১ হাজার ১২৪ টাকা। মূল্যায়ন কমিটির এক সদস্য সমকালকে জানিয়েছেন, তিনটির কম শিডিউল জমা পড়ায় পুনঃদরপত্রের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যদিও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে একজন জমা দিলেও তা গ্রহণ করার নিয়ম রয়েছে।

নথি থেকে জানা গেছে, পুনঃদরপত্রে কমপক্ষে তিনটি শিডিউল জমার 'নিয়ম' মানা হয়নি। দ্বিতীয় দরপত্রে অংশ নেন এমপির ভাতিজার বন্ধু উজ্জ্বল বর্মণসহ দু'জন। আগের দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা মিজানুর রহমান চৌধুরীর অভিযোগ, তিনি শিডিউল কিনলেও বাধার কারণে জমা দিতে পারেননি। তাকে বাদ দেওয়ার কারণও জানায়নি রেল কর্তৃপক্ষ। কোনো নোটিশও পাননি। কিন্তু এর মধ্যেই এমপির ভাতিজা পুকুর নিজের দখলে নিয়েছেন।

পুনঃদরপত্রে ইজারা মূল্য ৭১ হাজার টাকা হলেও শিহাব ভূঁইয়া দর হেঁকেছেন সাত লাখ টাকা। ৯৫ শতাংশ আয়তনের পুকুরে মাত্র তিন বছর মাছ চাষ করে এত টাকা মুনাফা সম্ভব নয় জেনেও ১০ গুণ দর দেওয়ার কথা নিজেই জানিয়েছেন  শিহাব। তিনি বিএনপির সাবেক এমপি শামসুদ্দিন ইসহাকের শ্যালক। শিহাব বলেছেন, পুকুরটি গত ২৫-৩০ বছর একটি পরিবারের কবজায় ছিল। তাদের হাত থেকে উদ্ধার করতেই সাত লাখ টাকা দর দিয়েছেন।

সম্প্রতি রেলওয়ে অভিযান চালিয়ে ওই পুকুর পাড় থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করে। গত রোববার সকালে দেখা গেছে, শিহাব ভূঁইয়া আবার সেখানে দোকানপাট বসাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, দোকান তুলে ভাড়া দিয়ে ইজারার ব্যয় তোলার চেষ্টা করছেন।

ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেছেন, পুনঃদরপত্রে রেলেরই লাভ হয়েছে। তিন বছরে সাত লাখ টাকা পাবে রেল। কিন্তু ইজারার শর্ত অনুযায়ী, ইজারাদার মাছ চাষ ছাড়া অন্য কোনো কাজে জমি ব্যবহার করতে পারবেন না। দোকান তুললে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।