চট্টগ্রামে ১২ বছরে ৪৫০ কোটি টাকার স্বর্ণবার চোরাচালানের ঘটনায় অর্থ পাচার মামলায় জামিনে কারামুক্ত তিন আসামির হদিস মিলছে না। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় গ্রেপ্তার ও জবানবন্দি দেওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় করোনাকালে ভার্চুয়াল হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছিলেন এই তিনজনসহ মোট পাঁচ আসামি। তবে রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত জামিনের বিরুদ্ধে আবেদন করায় আপিল বিভাগ তাদের জামিন স্থগিত করে দেন। এ অবস্থায় অন্য দুই আসামি কারামুক্ত হতে পারেননি। মামলার অন্য সাত আসামি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। চাঞ্চল্যকর মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড স্কোয়াড অর্গানাইজড ক্রাইম।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর ছাদেক আলী সমকালকে বলেন, হাইকোর্টের ভার্চুয়াল কোর্ট থেকে কয়েকজন আসামি কূটকৌশলে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে গেছেন। ২০ আসামির মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করার পর তারা আদালতে জবানবন্দি দেন। তবে মূল আসামি আবুসহ অন্যরা পালিয়ে আছেন। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ডকুমেন্টারি তদন্ত এগিয়ে চলছে।

পলাতক টিটু ধরের আইনজীবী নয়ন কুমার ধর বলেন, আমার মক্কেল জামিনে মুক্ত হওয়ার পর বিশ্রামে আছেন। তাই আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সময় চেয়েছিলাম। আদালত সময় দেননি। আপিল বিভাগের জামিন বাতিল নিয়ে কী করা যায়, সেটা নিয়ে আমরা ভাবছি।

চলতি বছরের ১১ জুন আন্তর্জাতিক স্বর্ণবার চোরাচালানের মূল হোতা আবু আহম্মদকে প্রধান আসামি করে চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানায় মানি লন্ডারিং আইনে ২০ জনকে আসামি করে একটি স্বর্ণবার মামলা হয়। ঢাকা সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড স্কোয়াড অর্গানাইজড ক্রাইমের এসআই মো. হারুন উর রশীদ বাদী হয়ে এ মামলা করেন। পরে চট্টগ্রাম থেকে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৩ জুন ১২ আসামি চট্টগ্রামের ছয়টি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তারপর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

এ মামলার অন্যতম আসামি টিটু ধর হাইকোর্টের ভার্চুয়াল আদালতে জামিন আবেদন করলে সেখানে চলতি বছরের ১১ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়ে চট্টগ্রাম কারাগার থেকে মুক্তি পান। বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষের নজরে এলে আপিল বিভাগে ভার্চুয়াল হাইকোর্টের জামিন স্থগিত করতে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল গ্রহণ করে টিটু ধরের জামিন আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে তাকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত তারিখ গত ১৯ নভেম্বরে চট্টগ্রাম আদালতে টিটু ধর আত্মসমর্পণ করেননি। এ সময় তার পক্ষে আইনজীবী নয়ন কুমার ধর হাজির হওয়ার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে এ আবেদন খারিজ করে দিয়ে টিটু ধরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করেন। একইভাবে জামিনে মুক্ত দুই আসামি ওবায়দুল আকবর ও রুবেল চক্রবর্তীও উধাও হয়ে গেছেন। তবে মামলার অপর দুই আসামি সাগর মহাজন ও এমতিয়াজ হোসেনের জামিন আপিল বিভাগ স্থগিত করে দেন। জামিনপ্রাপ্ত অন্যরা মুক্ত হতে পারলেও তারা ছাড়া পাননি।

সিআইপি তদন্তে নেমে চট্টগ্রামের ২৪ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১২ বছরে স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডি ব্যবসায় সাড়ে চারশ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত পায়। পাঁচ ব্যাংকে আবুর নিজের নামে থাকা ছয়টি এবং সাতটি প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১৮টি ব্যাংক হিসাবে এসব অর্থ লেনদেন করেন তিনি। মোবাইল ফোন, কসমেটিকস, বডি স্প্রে, ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর আড়ালে এ লেনদেন করা হয়। এর আগে ২০১৯ সালে সিআইডির আবেদনে চট্টগ্রামের পাঁচ ব্যাংকে আবুর নিজের নামে থাকা ছয়টি এবং সাতটি প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১৮টি ব্যাংক হিসাবে লেনদেন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং আইনের এ মামলায় ২০ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা সাত আসামির মধ্যে রয়েছেন- ফটিকছড়ির আবু রাশেদ ও জিয়া উদ্দিন বাবলু, চন্দনাইশের ইমরানুল হক মো. কফিল চৌধুরী, লোহাগাড়ার মোহাম্মদ আলী, ফরিদুল আলম ও মোহাম্মদ এরশাদুল আলম এবং লোহাগাড়ার মো. হাসান।

জামিনে মুক্ত হয়ে পলাতক তিনজন হলেন- কোতোয়ালির হাজারী টিটু ধর ও রুবেল চক্রবর্তী এবং ফটিকছড়ির ওবায়দুল আকবর। জামিন স্থগিত হওয়ায় কারাগারে রয়েছেন আনোয়ারার সাগর মহাজন ও ঢাকার ওয়ারীর এমতিয়াজ হোসেন।

প্রধান আসামি আবু আহম্মদ ছাড়াও পলাতক রয়েছেন ফটিকছড়ির ইকবাল মোহাম্মদ নেজাম, লোহাগাড়ার এস এম আসিফুর রহমান, ফটিকছড়ির মো. রফিক, মিনহাজ উদ্দিন, ঢাকার পান্নিতলার দীনবন্ধু সরকার, হাটহাজারীর আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও রিয়াজউদ্দিন বাজারের শাহজাহান।

আদালতে ১২ আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরও ছয় ব্যক্তির এই চোরাচালান ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। আবু রাশেদ তার জবানবন্দিতে জানান, অবৈধ ব্যবসায় আবদুর রহিম, আসিফুর রহমান, জিকু, হোসেন ও বাবলুও জড়িত রয়েছেন। এরশাদ আলম জানান, সৌদি ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম ও তার ছোট ভাই ফরিদুল আলম এ ব্যবসায় জড়িত। ইমরানুল হক জানান, পারভেজ এবি ট্রেডার্সের ম্যানেজার তাকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছেন।