বর্তমান সময়ে যেখানে টাকার অভাবে অনেকে চিকিৎসা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সেই সময়ে মাত্র 'এক' টাকার বিনিময়ে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে ওষুধও পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন'। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের সেবায় এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে 'বিদ্যানন্দ মা ও শিশু হাসপাতাল' চালু করেছে সংগঠনটি। টাকার পরিবর্তে নূ্যনতম মূল্যের যে কোনো জিনিসের বিনিময়েও এখানে সেবা নিতে পারবেন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। প্রাচীন বিনিময় প্রথার মাধ্যমে গরিব মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার এ উদ্যোগ দেশে এটিই প্রথম। প্রতিমাসে ১০ হাজার দরিদ্র মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নগরের পাহাড়তলী সাগরিকা রোডে আটতলা একটি ভবনে হাসপাতালটি চালু করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পর্যটন এলাকাখ্যাত সাগরিকাসহ আশপাশের বিশাল এলাকাজুড়ে এমন বৃহৎ দাতব্য কোনো হাসপাতাল না থাকায় নতুন এ হাসপাতালটি স্বস্তি জোগাচ্ছে লাখো দরিদ্র বাসিন্দাকে।

নতুন এই হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ ছাড়াও করোনাভাইরাসে (কভিড-১৯) আক্রান্তদের সহায়তা দিতে ১৬ শয্যার একটি পৃথক ওয়ার্ডও রাখা হয়েছে। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে ২১ শয্যার জেনারেল ওয়ার্ড, ১২ শয্যার ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড ও এক শয্যার ডেন্টাল ইউনিটে সেবা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রান্তিক জনপদে চিকিৎসা দিতে রাখা হয়েছে টেলিমেডিসিন সেবাও। ছিন্নমূল মানুষের সেবায় সার্বক্ষণিক দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ কনসালট্যান্ট যুক্ত থাকবেন এতে। প্রাথমিকভাবে আউটডোর সেবা চালু হলেও পর্যায়ক্রমে ইনডোর সেবা চালু করা হবে। আর ইনডোর সেবা চালু হলে মাত্র এক টাকা খরচেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষ থাকা-খাওয়াসহ সব ধরনের চিকিৎসাসেবা পাবেন এখানে। হাসপাতালটি উদ্বোধন করে এটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য প্রশাসনও। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চালু হওয়া এই হাসপাতালে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেল বলেন, মানবতার সেবায় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন অনুকরণীয় দায়িত্ব পালন করছে। করোনার সংকট মোকাবিলায় স্থাপিত কভিড ফিল্ড হাসপাতাল একটি মাইলফলক হয়ে আছে। দরিদ্র মানুষ স্বল্পমূল্যে সেবা পেতে পারে সেজন্য প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল্ডিংটি বিদ্যানন্দকে দেওয়া হয়েছে। দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই হাসপাতাল অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, করোনার এমন দুঃসময়ে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন দরিদ্র মানুষকে এক টাকায় চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সুযোগ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। তাদের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। হাসপাতালটির অগ্রযাত্রায় করপোরেশন থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।

সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, এ অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ হাসপাতালটি থেকে মাত্র এক টাকায় চিকিৎসাসেবা পাবেন। স্বাস্থ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পরামর্শক ও নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ব্যুরোপ্রধান জুলহাস আলম বলেন, চিকিৎসাসেবায় এটি একটি মাইলফলক। বিশ্বদরবারে বিদ্যানন্দের নাম উচ্চারিত হওয়া শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও বিদ্যানন্দ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে। নতুন মা ও শিশু হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে সর্বত্র সেবার ধারণা ছড়িয়ে পড়বে বলে আমার বিশ্বাস।

চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী থানার জনসংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মধ্যাংশে পাহাড়তলী ওয়ার্ডের অবস্থান। এর পশ্চিমে ১২নং সরাইপাড়া ওয়ার্ড, দক্ষিণে ১২নং সরাইপাড়া ও ২৩নং উত্তর পাঠানটুলী ওয়ার্ড। পূর্বে ১৪নং লালখান বাজার ওয়ার্ড, উত্তরে ৮নং শুলকবহর ওয়ার্ড ও ৯নং উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড অবস্থিত। ওয়ার্ডের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বড় দাতব্য কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় সেবা পেতে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হতো এলাকার দরিদ্র বাসিন্দাদের। তবে বিদ্যানন্দের উদ্যোগে নতুন চালু হওয়া হাসপাতালটির মাধ্যমে আশার আলো দেখছেন তারা। হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা সরাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা মমতাজ বেগম বলেন, 'টাকার অভাবে অনেক দিন ধরে নিজের চিকিৎসা করাতে পারিনি। যেতে পারিনি চিকিৎসকের কাছেও। ফার্মেসি থেকে না বুঝে কেনা ওষুধই খেয়েছি। মাত্র এক টাকায় চিকিৎসক দেখার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার খবর পেয়ে এখানে এসেছি। এমন সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা আমাদের মতো গরিবদের জন্য আশীর্বাদ।'

ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে আসা সীমা চৌধুরী বলেন, 'বেশ কিছু দিন ধরে মেয়ে বুকে ব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। এখানে এসে মাত্র এক টাকায় চিকিৎসার সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধও পেয়েছি। এমন সেবা আমাদের জন্য অকল্পনীয়।'

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক শিপ্রা দাশ সমকালকে বলেন, মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতেই এক টাকার সেবা চালু করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের একটি হাসপাতাল চালু করা আমাদের স্বপ্ন ছিল। অবশেষে সেটি বাস্তবে রূপ পাওয়ায় আমরা আনন্দিত। এক টাকায় চিকিৎসা পাওয়ার তথ্যটি সাধারণ মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে ক্যাম্পেইন শুরু করেছি। যখন একজন রোগী নামমাত্র টাকার বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাসপাতাল ত্যাগ করেন, সেটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।'

হাসপাতালের সমন্বয়ক জামাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, করোনার বিষয়টি মাথায় রেখে এখানে আলাদা কভিড ওয়ার্ড রাখা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষরাও মাত্র এক টাকায় চিকিৎসা ও ওষুধ পাবেন এখানে। কারও কাছে এক টাকাও যদি না থাকে সেক্ষেত্রে তিনি পুরোনো কোনো জিনিস দিয়ে সেবা নিতে পারবেন।