বিলুপ্তপ্রায় ও বিরল প্রজাতির গাছের বাগান তৈরি করেছেন মাহবুবুল ইসলাম পলাশ। তার নিজের বাগানেই রয়েছে প্রায় তিনশ ধরনের গাছ। হৈমন্তি, ঝুমকোবাদি, নীল পারুল, কন্যারি, নীল মণিলতা থেকে শুরু করে সুন্দরবনের নোনাপানির সুন্দরী, গোলপাতাও রয়েছে তার বাগানে। শুধু তাই নয়, গাছপ্রেমিক পলাশ এলাকার কারও মেয়েশিশু জন্ম নিলে তার বাড়িতে গিয়ে চারা রোপণ করেন সেই মেয়ের নামে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানে তিনি বিরল গাছ সরবরাহ করেছেন।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা পলাশের বাড়ি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে। কর্মসূত্রে থাকেন রাজশাহী নগরীর টিকাপাড়ায়।
পলাশ জানান, গ্রামের বাড়ি কামারখন্দে ছয় বিঘা জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন শখের বাগান। এতে ৩০০ প্রজাতির পাঁচ হাজারের বেশি ফল, ফুল, ঔষধি, কাঠজাতীয় এবং বনের বিলুপ্ত প্রজাতির গাছ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৪৫টি প্রজাতি 'মহাবিপন্ন'।
তিনি জানান, দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০০০ সালে তিনি প্রথম বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন। সে সময় তিনি হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে বিভিন্ন ফলদ গাছের চারা রোপণ করেন। ২০০৭ সালে এক বন কর্মকর্তার কাছ থেকে ৭০০ টাকায় ৭০০টি সেগুন গাছের চারা কেনেন। এরপর শুরু হয় তার শখের বাগান। এখন তার বাগানে সুন্দরবনের নোনাপানির সুন্দরীসহ আরও ১০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। এ ছাড়াও বিরল ও মহাবিপন্ন ৭৫ প্রজাতির বিভিন্ন গাছ ও বিরল প্রজাতির ২৬ ধরনের ফুলগাছ রয়েছে। শুক্র-শনিবার ছুটির দিনে তিনি রাজশাহী থেকে ছুটে যান সিরাজগঞ্জ। সেখানে তিনি বাগানের পরিচর্যা করেন। তার অবর্তমানে তার মা কাজ করেন। পরিচর্যার জন্য একজন শ্রমিক রেখেছেন।
পলাশের সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রজাতির ফুল হলো- ঝুমকোবাদি, নীল পারুল, কন্যারি ও নীল মণিলতা। কাঠ ও অন্যান্য গাছের মধ্যে আছে গুটগুটিয়া, মাল্লাম, বান্দরহোলা, কুসুম, মণিরাজ, কুঠিশর, কাটাবাজনা, ডোলসমুদ্র, চাপালিশ, লোহা ও তেলসুর। সুন্দরবনের নোনাপানির গাছের মধ্যে রয়েছে সুন্দরী, গোলপাতা, কৃপা, খোলসা, কাঁকড়া, পশুর, উড়া, গড়ান, পাইন ও কেওড়া।
তার বাগানে রয়েছে সিঁদুর গাছ। এই গাছ থেকে সিঁথিতে দেওয়া সিঁদুর তৈরি হয়। রয়েছে বাহারি পানমসলা গাছ। বুদ্ধনারকেল গাছও আছে তার সংগ্রহে। চমৎকার এই ফল পাখি ও মানুষ সবাই খায়। এ ছাড়াও রয়েছে তেলিগর্জন, ধলিগর্জন ও শ্বেতগর্জন। এদের মধ্যে শ্বেতগর্জন উপকূলীয় এলাকা ছাড়া হয় না। রয়েছে গলায় দেওয়া যজ্ঞপ্রবীত তৈরির রুদ্রলক্ষ গাছ।
টবে সুন্দরী গাছ ও সমতলে চা-কফি চাষে সফলতা :সুন্দরী গাছ নিয়ে সফল হয়েছেন মাহবুবুল ইসলাম পলাশ। বাড়ির বারান্দায় শোভাবর্ধন করছে চারটি সুন্দরী। এ ছাড়াও তিনি সমতলে ৯টি সুন্দরী গাছের চারা রোপণ করেছেন। সুন্দরী গাছকে এ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে তুলতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে।
বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে বৃক্ষরোপণ : সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে এবং বৃক্ষরোপণের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরিতে নিরলস কাজ করছেন তরুণ পলাশ। এলাকায় কোনো বাড়িতে মেয়েসন্তান জন্ম নেওয়ার খবর পেলে উন্নত কাঠজাতীয় গাছের চারা নিয়ে সেই বাড়িতে ছুটে যান এবং নিজ হাতে সেটি রোপণ করে আসেন। একই সঙ্গে কন্যাশিশুর পরিবারের সদস্যদের বোঝান মেয়েরা সমাজের বোঝা নয়। ছেলে-মেয়ের পার্থক্য না খুঁজতে পরামর্শ দেন তিনি।
পাখির বাসস্থান তৈরিতেও উদ্যোগ :পলাশ জানান, তার বাগানে সিভিট নামের এক প্রজাতির গাছ রোপণ করেছেন। সিভিট গাছের ফল কাকাতুয়া, ময়না ও টিয়ার খুবই পছন্দের। এখন তার বাগানে এসব পাখির দেখা মেলে। এখানে পাখি বাসা তৈরি ও বাচ্চা উৎপাদন করছে। তিনি তার বাগান ছাড়াও সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পাড়ে সিভিট গাছের চারা রোপণ করেছেন। পাখির নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করে দিতে গাছে গাছে মাটির হাঁড়ি ও ঝুড়ি বেঁধে দিয়েছেন তিনি।

বিষয় : বিরল বৃক্ষপালক

মন্তব্য করুন