মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকায় 'নৈতিক স্কুল' গড়ে তুলেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. গাজী সালেহ উদ্দিন। সেখানে পড়াশোনা করছে সুবিধাবঞ্চিত বস্তির ৫১ শিশু। আলোর পথে হাঁটছে তারা। শিখছে গান, নাচ, বাঁশি ও গিটার বাজানো। গত পাঁচ বছরে বদলে গেছে এ শিশুদের জীবনধারা।
ড. গাজী স্যারকে এই শিশুরা ডাকে 'দাদু ভাই' নামে। প্রতি মাসে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার ১২ হাজার টাকা স্কুলের পেছনে ব্যয় করছেন তিনি। তার সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান ১০ জন ছাত্রও শিশুদের অবৈতনিক শিক্ষা দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম নগরীর ঝাউতলা বস্তিতে বসবাস করে শিশু রইসুল (ছদ্মনাম)। তার বাবা রিকশা চালান, মা মানুষের বাসায় কাজ করেন। আগে বস্তিতে অন্যদের সঙ্গে সেও গাম (এক ধরনের মাদক) খেত। চুরি করত, প্রায়ই মারামারি করত। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. গাজী সালেহ উদ্দিন স্যারের উদ্যোগ পাল্টে দিয়েছে তার জীবন। মাদকমুক্ত হয়ে রইসুল এখন শিখছে পড়াশোনা, নিচ্ছে নৈতিকতার দীক্ষা।
শুধু শিশু রইসুল নয়, ঝাউতলা বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শাহাদাত হোসেন, আসমা আক্তার, সুমাইয়া আক্তার, শাবনুর আক্তার, হোসেন আহমদ, ফারুক, ফাতেমা আক্তার, তাহসিন আক্তার নোভা, খাদিজা আক্তার জেরিন, শারমিন আক্তারসহ অর্ধশত শিশু এখন মাদক, মারামারি ও অসামাজিক কাজ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে এসেছে। এই শিশু-কিশোরদের অবৈতনিক শিক্ষার পাশাপাশি বাবা, মা, পাড়ার কিংবা বস্তির ছোট-বড় সবার সঙ্গে আচার-ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া হয় 'নৈতিক স্কুলে'। ২০১৫ সাল থেকে এ স্কুলে মূলত বস্তির ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলে এ স্কুলের কার্যক্রম।
নৈতিক স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. গাজী সালেহ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা এখন নৈতিকতার। তাই ২০১৫ সালে সুবিধাবঞ্চিত ২০ জন বস্তির শিশুকে নিয়ে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করি। এখন অর্ধশত শিশু এ স্কুলের শিক্ষার্থী। যারা আগে মাদক নিত, বস্তিতে মারামারি করত, একে অপরকে গালাগাল করত, কেউ চুরির সঙ্গেও জড়িত ছিল- তারা এখন সুন্দর জীবনের পথে হাঁটছে।
এ স্কুলের সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রাক্তন ছাত্র রফিকুজ্জামান তৌহিদ। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র মো. মহসিন, বাংলা বিভাগের ছাত্র তানবির আহসান, জীববিদ্যার ছাত্র মো. রাশেদ আবদুল্লাহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করছেন। শিশুদের নাচ, গান ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখাচ্ছেন শিল্পী মৌসুমী দেবী, জয়ন্তী দাশ, বাপ্পী ও জিমি।
গানের শিক্ষক জয়ন্তী দাশ বলেন, স্কুলের শিশুরা ৪০ থেকে ৫০টি গান শিখেছে। এদের অনেকে অসম্ভব মেধাবী। তাদের গানের কলি বারবার বলতে হয় না। নাচের শিক্ষক শিল্পী মৌসুমী দেবী বলেন, আট থেকে ১০টি নাচ শেখানো হয়েছে তাদের। তারা ভালো নাচতে পারে। আগ্রহও রয়েছে এ ব্যাপারে।
গত মঙ্গলবার সরেজমিন নগরীর খুলশীর ঝাউতলা বিজিএমই ভবনের পাশে নৈতিক স্কুলে গিয়ে দেখা যায় পড়াশোনায় ব্যস্ত শিশুরা। কেউ বাংলায় অ আ লিখছে। কেউ ইংরেজিতে এ বি সি ডি লিখছে। কাউকে অঙ্কের এক, দুই শেখানো হচ্ছে। ফুল, ফল অঙ্কন করতে দেখা গেল অনেককে। পৌনে এক ঘণ্টা লেখাপড়ার পর হয় গান ও নাচের আসর। দেখা গেল, সম্মিলিতভাবে শিশু-কিশোররা গাইছে, 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ...।'
এ স্কুলের দুটি রুমে পড়াশোনা করানো হয় শিশুদের। বৈচিত্র্যময় শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে রুমগুলো। দুটি ক্লাস রুম নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। স্কুলের সব শিক্ষার্থীই এখন তাদের বাবা-মা ও নিজের নাম বাংলা ও ইংরেজিতে শিখতে ও বলতে পারছে। নিত্যনতুন ছড়া-কবিতা শিখছে তারা।
নৈতিক স্কুলের শিক্ষার্থী কোহিনুর আক্তার জানায়, চার বছর ধরে সে এ স্কুলে পড়াশোনা করছে। আগে সে নিজের বাবা-মা কারও নাম লিখতে পারত না, কিন্তু এখন সবই পারে। বাংলায় ও ইংরেজিতে ১৫টি কবিতা-ছড়া বলতে পারে সে।
স্কুল পরিচালনায় নিয়োজিত রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রাক্তন ছাত্র রফিকুজ্জামান তৌহিদ বলেন, শিক্ষার্থীদের বছরে দু'বার গাজী স্যার নিজের খরচে স্কুল ড্রেস ও বই-খাতা কিনে দেন। শিক্ষকরা স্বেচ্ছাশ্রম দিলেও স্কুলের আনুষঙ্গিক খরচ স্যারের পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা থেকে করা হয়।