জীবনের বেশিরভাগ সময় বইয়ের সঙ্গে কেটেছে অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক নজরুল হক নীলুর। নিজে পড়েছেন, অন্যকে পড়িয়েছেন। মৃত্যুর পরও বইয়ের মাঝে বেঁচে থাকার স্বপ্ন তার। নিঃসন্তান জীবনে বইকে ভালোবেসেছেন সন্তানের মতো। তার স্ত্রীও অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। স্বামীর বইপ্রেমে মজেছেন তিনিও। তাই দু'জনের পেনশনের টাকায় নিয়েছেন অনন্য উদ্যোগ; মানুষকে আলোকিত করতে গড়ে তুলেছেন পাঠাগার।

বানারীপাড়া ডিগ্রি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক নজরুল হক নীলু ২০১৮ সালের জুনে অবসর নেন। তার স্ত্রী শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মাহমুদা বেগম মুনমুন অবসরে যান এক বছর আগে। এরই মধ্যে নজরুল হকের সংগ্রহে তিন সহস্রাধিক বই, যেগুলো পড়ার জন্য কিনেছিলেন গত ৫০ বছর ধরে; সেগুলো দিয়েই পাঠাগারের যাত্রা শুরু।

বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় মনসাবাড়ি সড়কে পৈতৃক বাড়িতে নবনির্মিত তিনতলা ভবনের নিচতলায় ২৪০০ বর্গফুটের ফ্লোরে পাঠাগারটি স্থাপন করা হয়েছে। করোনা সংকটের কারণে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে না পারায় পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে সেটি। পরিস্থিতির উন্নতি হলে দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে পাঠাগারটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথা জানিয়েছেন নজরুল হক।

বইপ্রেমী এ মানুষটি জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তিনি বরিশালের একজন  নিরীহ, শান্তশিষ্ট মানুষ। তবে যে কোনো গণতান্ত্রিক ও সামাজিক আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকেন তেজোদীপ্ত মন নিয়ে। ষাটের দশকে রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন বিল্পবী ছাত্র ইউনিয়ন দিয়ে রাজনীতি শুরু করেন। এখনও তার সঙ্গেই আছেন।

অন্যদের মতো ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তায় নিজ বাড়িটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করেননি তিনি। পাঠাগার করার কারণ জানতে চাইলে নজরুল হক বলেন, মনের অন্ধকার দূর এবং সত্যকে জানতে জ্ঞানের বিকল্প নেই। যান্ত্রিক ও প্রযুক্তির যুগে আমাদের তরুণ সমাজের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ কমেছে। নতুন প্রজন্ম মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহারে মাত্রাতিরিক্ত আশক্ত হয়ে পড়েছে। এগুলো যত কম ব্যবহার হবে ততই মঙ্গল। তাই নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনা এখন অতি জরুরি। কারণ বই-ই একমাত্র প্রাকৃতিক।

সরেজমিন দেখা যায়, সাতটি আলমিরায় তাকে তাকে সাজানো বই। চারটি টেবিলে পাঠকদের বসার জন্য রাখা হয়েছে ৬০টি চেয়ার। শুধু বই নয়; অনেক পুরোনো সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন, দৈনিক সংবাদপত্রের বিশেষ সংখ্যাও সংরক্ষিত রয়েছে এ পাঠাগারে।

ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, জীববৈচিত্র্য নিয়ে লেখা বইয়ের আধিক্য এখানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার, দেবব্রত পাল, আবুল বাশারসহ দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখকদের বই রাখা হয়েছে এখানে। রয়েছে ধর্ম নিয়ে গবেষণাধর্মী বই। জনপ্রিয় সাপ্তাহিক 'দেশ', 'বিচিত্রা'সহ বিভিন্ন ম্যাগাজিনের ৩০ বছর আগের সংখ্যাও আছে।

নজরুল হক বলেন, গবেষণাধর্মী প্রায় সব ধরনের বই আছে পাঠাগারে। আরও সংগ্রহের চেষ্টা করছি। শিক্ষামূলক সভা-সেমিনার করার জন্য পাঠাগারটি বিনামূল্যে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।

এত সংখ্যক বই সংগ্রহে থাকার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সপ্তম শ্রেণির ছাত্রাবস্থা থেকে বই পড়ার নেশা। যে কোনোভাবে হাতে কিছু টাকা এলেই বই কিনেছেন। সন্ধ্যায় বই পড়া শুরু করে ভোর হয়ে গেছে, এমন ঘটনা ঘটেছে জীবনে অনেকবার।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি বই পড়া শেষে তিনি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করেছেন। দুই বছর আগেও থাকতেন বাবার রেখে যাওয়া আধাপাকা ঘরে। তখন বৃষ্টির পানি থেকে বইগুলো রক্ষা করতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হতো। একটা সময়ে মাথায় আসে- মৃত্যুর পর বইগুলোর কী হবে? এমন ভাবনা থেকেই পাঠাগার গড়ার পরিকল্পনা।

নজরুল হক জানান, তার স্ত্রী মাহমুদা বেগম মুনমুন বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া সম্পদ বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা এনেছেন। ওই টাকা দিয়েই পৈতৃক জমিতে ৫ শতাংশ জমির ওপর তিন বছর আগে ভবন নির্মাণ শুরু করেন। নিচতলার পুরোটা রেখেছেন পাঠাগারের জন্য; দোতলায় নিজেরা থাকেন।

মৃত্যুর পর পাঠাগারটি কীভাবে পরিচালিত হবে, তার পরিকল্পনা বিষয়ে নজরুল হক বলেন, পাঠাগারের জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করবেন। সেখানে তিনি নগদ ১০ লাখ টাকা দেবেন। এ ছাড়া তিনতলার মোট তিনটি ফ্লোরের একটি ভাড়া পাবে পাঠাগারের ট্রাস্ট।

নজরুল হক জানান, শীত মৌসুমের পর করোনা সংকটের উন্নতি হলে ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, কবি বেল্লাল হোসেনসহ বরেণ্য লেখক-কবিদের নিয়ে পাঠাগারটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।

মাহমুদা বেগম মুনমুন বলেন, বিয়ের পর থেকেই স্বামীর বই পড়ার নেশা কাছ থেকে দেখেছি। তার ভেতর পাঠাগার গড়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। অর্থ সংকটে সেটি এতদিন সম্ভব হয়নি। এখন সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় তিনি খুশি। স্বামীর ইচ্ছা পূরণে স্ত্রী হিসেবে সব সময় সহযোগিতা করছেন।