পেট্রোবাংলা গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত (পরিশোধন) করে পাওয়া তেল নির্ধারিত মূল্যে বিপিসির কাছে বিক্রির বাধ্যবাধকতা রয়েছে বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই এ চুক্তি লঙ্ঘন করে 'কালোবাজারে' তেল বিক্রি করছে। কনডেনসেট পরিশোধন না করেই মানহীন তেল বাইরে বিক্রি করছে বেসরকারি ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্টগুলো।

সম্প্রতি জানা গেছে, বিপিসির তিন বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনার বাজারজাতকৃত তেলও মানসম্মত নয়! এগুলোর তেলের নমুনা পরীক্ষা করে বিএসটিআই নির্ধারিত মান পাওয়া যায়নি। কালোবাজারে 'বাংলা তেল' নামে পরিচিত এই তেল ব্যবহারে বেড়ে যাচ্ছে জ্বালানি খরচ, নষ্ট হচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিনসহ যন্ত্রপাতি, ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশেরও।

বেসরকারি রিফাইনারি মালিক, ট্যাঙ্কলরি মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও ফিলিং স্টেশন মালিকসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার জ্বালানি তেলের এ 'ভেজাল বাণিজ্যের' সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়াও জড়িত বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিপণন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিপো পর্যায়ে বেশি দামের তেলের সঙ্গে কম দামের তেলের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এই গোঁজামিল দেওয়া হচ্ছে। আবার তাপমাত্রার হেরফের করেও ওজনে কারচুপি করা হচ্ছে।

গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনের সময় সংগৃহীত কনডেনসেট থেকে পেট্রোল-অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানি তেল তৈরি করা হয়। বেসরকারি খাতের ১৫টি রিফাইনারি পেট্রোবাংলার কাছ থেকে কনডেনসেট সংগ্রহ করে। যা পরিশোধন করে উৎপাদিত তেল নির্দিষ্ট মূল্যে বিপিসির কাছে বিক্রির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি বেশিরভাগ রিফাইনারিই কনডেনসেট যথাযথভাবে পরিশোধন করে না কিংবা কখনও পরিশোধন করে না। আবার বাড়তি লাভের জন্য চুক্তি ভেঙে অপরিশোধিত তেল 'কালোবাজারেও' ছেড়ে দেয়। ফিলিং স্টেশন, ডিলার-এজেন্ট ও ডিসপেন্সিং ইউনিটগুলো এই তেলের মূল ক্রেতা। কালোবাজারে এগুলো 'বাংলা তেল' হিসেবেই পরিচিত।

রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) এজিএম (কোয়ালিটি কট্রোল) মুজিবুর রহমান সমকালকে বলেন, 'ইআরএলে পরিশোধিত ও ফিনিশ প্রোডাক্ট হিসেবে বিদেশ থেকে আমদানি করা তেলের নমুনা বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করা হয়। মান নিশ্চিত করেই বিপিসির বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তেল সরবরাহ করা হয়। সেখান থেকে বাজারজাত করার সময় কোনো না কোনো পয়েন্টে তেলে ভেজাল দেওয়া হচ্ছে। হয়তো এমন ভোজালের কারণে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার তেলে নির্ধারিত মান পাওয়া যায়নি।'

জ্বালানি তেলের মান নির্ধারণ করে দিয়েছে বিএসটিআই। অকটেনের আরওএন (রিসার্চ অকটেন নাম্বার) মান নূ্যনতম ৯৫ ও পেট্রোলের মান ৮৯। কিন্তু এই মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। মানসম্মত তেল সরবরাহ করতে না পারায় গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে বেসরকারি ১২ কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্টে কনডেনসেট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ডিজেল ও পেট্রোল নেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে বিপিসি।

পদ্মা মেঘনা যমুনার তেলও মানহীন: তেল মানসম্মত কিনা, তা অনুসন্ধান করতে গত ২১ সেপ্টেম্বর পদ্মা অয়েলের গোদনাইল ডিপো, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের গোদনাইল ডিপো ও ফতুল্লা ডিপো এবং যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোতে 'সারপ্রাইজ ভিজিট' করে বিপিসির প্রতিনিধি দল। চারটি ডিপো থেকে অকটেন, ডিজেল ও পেট্রোলের নমুনা সংগ্রহ করে ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) ল্যাবে পরীক্ষা করানো হয়। কিন্তু চার ডিপোর কোনোটির তেলেই বিএসটিআই নির্ধারিত আরওএন মান পাওয়া যায়নি।

গত ১১ নভেম্বর বিপণন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে দেওয়া বিপিসি সচিব মো. লাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক চিঠিতে জানানো হয়, তিন প্রতিষ্ঠানের তেলের নমুনা পরীক্ষায় সঠিক মান পাওয়া যায়নি। চিঠিতে জানানো হয়, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের গোদনাইল ডিপোতে অকটেনের আরওএন ৯১ দশমিক ৭, পেট্রোলের আরওএন ৮৭, ফতুল্লা ডিপোতে অকটেনের আরওএন ৯৩ দশমিক ২ এবং পেট্রোলের আরওএন মান ৮২ পাওয়া গেছে। নির্ধারিত মানের তেল পাওয়া যায়নি অন্য দুই প্রতিষ্ঠানের ডিপোতেও। নিম্নমানের অকটেন ও পেট্রোল মজুদ রাখার বিষয়ে চিঠিতে সংশ্নিষ্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মতামতও চাওয়া হয়।

বিপিসির এজিএম (মার্কেটিং) মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানিয়েছেন, বিপিসির তিন বিপণন প্রতিষ্ঠানের বাজারজাতকৃত তেল নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল বিএসটিআই। বিষয়টি তারা জ্বালানি মন্ত্রণালয়েও জানিয়েছিল। তাই তিন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ডিপোতে সারপ্রাইজ ভিজিট করে তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যে ফলাফল পাওয়া গেছে, তা বিএসটিআই মানের নয়। তবে নানা কারণে তেলের মানের হেরফের হতে পারে।

সংশ্নিষ্ট ডিপোগুলোর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীও জানান, যে ট্যাঙ্কার জাহাজে করে পেট্রোল পাঠানো হয়, সেই জাহাজে করে আবার ডিজেলও পাঠানো হয়। এ কারণে মানের ক্ষেত্রে সামান্য এদিক-ওদিক হয়। মূল ডিপো থেকে পাওয়া মানের তেলই ডিপো থেকে বিক্রি করা হয়।

ডিপো ইনচার্জদের শোকজ: নির্ধারিত মান না পাওয়ায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার ডিপো প্রধানদের শোকজ করে বিপিসি। গত ১১ নভেম্বর বিপিসির সচিব মো. লাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক এক চিঠিতে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের গোদনাইল ডিপো ইনচার্জ ম্যানেজার (অপারেশন) মো. লুৎফর রহমান, ফতুল্লা ডিপো ইনচার্জ ম্যানেজার (অপারেশন) আশফাক উল হক, পদ্মা অয়েলের গোদনাইল ডিপো ইনচার্জ শাহজাহান কবির চৌধুরী, যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপো ইনচার্জ নজমুল হাসানকে এই শোকজ করা হয়। তবে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও আলাদা আলাদা নিবন্ধিত কোম্পানি।

তিন প্রতিষ্ঠানের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানহীন তেল সরবরাহের কারণে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে জানার এখতিয়ার রয়েছে বিপিসির। প্রয়োজনে তারা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে পারে। কিন্তু বিপণন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সরাসরি শোকজ করতে পারে না।

ভেজাল তেলের 'ব্ল্যাক মার্কেট': বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নির্দিষ্ট কিছু ফিলিং স্টেশন অপরিশোধিত অর্থাৎ ভেজাল তেল কিনে থাকে। বিপিসির তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজারজাত তেলের চেয়ে দাম অনেক কম হওয়ায় এসব ফিলিং স্টেশনগুলো সুযোগ লুফে নেয়। আবার বিপিসির পরিবর্তে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বিক্রি করলে কয়েক গুণ বেশি লাভ পাওয়া যায়। এ কারণে বেসরকারি রিফাইনারিগুলো চুক্তি ভঙ্গ করে 'ব্ল্যাক মার্কেটে' তেল বিক্রি করে দেয়।

ভেজাল তেলের জোগান বন্ধে বিপিসি প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে তেলের ফিলিং স্টেশনগুলোতে অভিযান চালায়। অভিযোগের সত্যতা মেলায় বিভিন্ন সময় বেশকিছু ফিলিং স্টেশন বন্ধও করে দেয় বিপিসি।

আপত্তি তুলেছিল সেনাবাহিনীও: সেনা সদর দপ্তরের কিউএমজি শাখা থেকে বিপিসিকে পাঠানো এক চিঠিতেও জ্বালানি তেলে ভেজাল হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। আশঙ্কা করা হয়েছিল, বিপিসির বিভিন্ন বিপণন প্রতিষ্ঠানের সাব ডিপো থেকে পাঠানো তেলে কনডেনসেট মেশানো হয়ে থাকতে পারে।

২০১৬ সালের ১৪ মার্চ কিউএমজি শাখার পক্ষে তৎকালীন মেজর মো. মোকারম আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বেসামরিক ফিলিং স্টেশন থেকে সংগৃহীত জ্বালানি তেল ও সেনাবাহিনীর সাপ্লাই ডিপো থেকে সংগৃহীত তেলে দৃশ্যমান পার্থক্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তেলের মান ঠিক রাখতে ডিপো থেকে ট্যাঙ্কারে তেল ভর্তির পর সিল করে পাঠানোর সুপারিশ করেন তারা। ভেজাল রোধে আরও কয়েকটি সুপারিশও করে সেনাবাহিনী। এ চিঠির ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহের ব্যবস্থাও করেছিল বিপিসি।

ধরা পড়লেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না: ২০১৭ সালে কনডেনসেট পরিশোধন না করে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে ফিলিং স্টেশনে বিক্রি করে দেয় বেসরকারি চৌধুরী রিফাইনারি, লার্ক পেট্রোলিয়াম, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল ও গোল্ডেন কনডেনসেট অয়েল নামে চারটি প্রতিষ্ঠান। এতে সরকারের জ্বালানি বিভাগের ৪২৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। বিষয়টি ধরা পড়লে একই বছরের ২৯ মে এ বিষয়ে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে একটি চিঠি ইস্যু করা হয়। কিন্তু এর এক দিন পরই ৩১ মে ক্ষতিপূরণ আদায় ছাড়াই অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোকে পুনরায় কনডেনসেট সরবরাহের লক্ষ্যে আরেকটি চিঠি ইস্যু করা হয়। এভাবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কোম্পানি ভেজাল তেল সরবরাহে অভিযুক্ত হয়। তবে সেগুলোর বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তেলে ভেজাল শুরু যেভাবে: বিপিসির তথ্যমতে, বিপিসির আওতাধীন বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে পেট্রোল বিক্রি করে ১১ হাজার ২৮৭ টন। অথচ ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পেট্রোল বিক্রি হয়েছিল ১৪ হাজার ৭৪৭ টন। এ ক্ষেত্রে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন পেট্রোল কম বিক্রি হওয়ায় সন্দেহ দেখা দেয়।

২০১৬ সালে বিপিসির তৎকালীন পরিচালক (বিপণন) মীর আলীর নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সরেজমিন অনুসন্ধান চালানো হয়। তখন তিন বিপণন প্রতিষ্ঠানের ৩৫০টির মতো ফিলিং স্টেশনের বেশিরভাগেই ভেজাল তেল বিক্রি ও দ্বিতীয় উৎস থেকে নিম্নমানের তেল সংগ্রহ করে বিক্রির প্রমাণ পায় পাওয়া যায়। এ কারণে বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি অনেক ফিলিং স্টেশন মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়। ভেজাল তেল সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ২০১৬ সালে ৪ এপ্রিল প্রতিটি জেলার প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের বিপিসির পক্ষ থেকে চিঠিও দেওয়া হয়।

তেলে ভেজালের শাস্তি: জ্বালানি তেলে ভেজাল করা হলে ধরন অনুযায়ী, 'দি বাংলাদেশ প্রেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট ১৯৩৪, ধারা- ২৩ (১), ১৯৭৪ সালের ধারা-৯ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ধারা-৪১ অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। তবে এ শাস্তির প্রয়োগ তেমন একটা ঘটেনি।