'আম্পান ছয় মাস হয়ি গেল। এহনো আমরা বাঁধের ওপর বাস করতিছি। আমাগির দিখার কেউনি। কনে যাব আমরা। ছয় মাস আগেও আমার সব ছেলো। ইটির বাড়ি, রান্নার ঘর, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি। কী ছেলো না আমার। এখন আমি রাস্তার ফকির। ভিটেবাড়ির ওপর দিয়ে বয়ে যাতিছে নদীর পানি। ছয় মাস ধরে বাঁধের ওপর থাকতিছি। খুব কষ্ট হতিছে। আর কদ্দিন এমনে থাকতি হবে আমাগির? আর তো পারতিসি নে, আমাগির একটু বাঁচাও।' সুপার সাইক্লোন আম্পানে সব হারিয়ে নিঃস্ব সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রিউলা ইউনিয়নের হাজরাখালী গ্রামের নূর ইসলামের স্ত্রী মাহাফুজা খাতুন (৭০) সম্প্রতি এভাবেই চোখের পানি ফেলে সমকালের কাছে দুর্ভোগের কথা জানান। আরেক বৃদ্ধা ফাতেমা খাতুন আম্পানের পর থেকেই নদীতে বিলীন হওয়া বসতবাড়ির ঠিক পাশে বেড়িবাঁধের ওপর মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।\হহাজরাখালী গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, 'আমার মতো অসংখ্য মানুষ বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। আশ্রয় নিয়েছি বাঁধের ওপরে। অনেকে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। বাড়িঘরের কোনো চিহ্ন নেই। বসতভিটার ওপর তৈরি হয়েছে নদী, বইছে জোয়ার-ভাটা। শীতকাল পড়েছে। শীতবস্ত্রের অভাব ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়া শিশুগুলো দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। শীতবস্ত্রের অভাবে শিশুরা কাবু হয়ে পড়েছে।' হাজরাখালী বেড়িবাঁধের ওপর ছয় মাস ধরে আশ্রয় নেওয়া ৭০টি পরিবারের মানুষ এভাবেই তাদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন। তারা অন্য কিছু চান না, তাদের দাবি- টেকসই বেড়িবাঁধ।\হআম্পান দুর্গত আশাশুনি উপজেলার প্রায় ২০ হাজার মানুষ এখনও নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বাস করছে। আম্পান আঘাত হানার ছয় মাস অতিবাহিত হলেও বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধের একাধিক জায়গায় এখনও সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ উপজেলার শ্রিউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধের ওপর টংঘর তৈরি করে এবং সাইক্লোন শেল্টারে শত শত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট, নেই শীতবস্ত্র। বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে তারা দিনাতিপাত করছে। বসতভিটায় কবে ফিরে যেতে পারবে তাও কেউ বলতে পারে না। অনিশ্চিত এক জীবন কাটছে তাদের।\হগত ২০ মে সাতক্ষীরা উপকূলবর্তী অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যায় আম্পান। বিধ্বস্ত হয় বিস্তীর্ণ জনপদ। সবচেয়ে ক্ষতি হয় জেলার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপকূলবর্তী অঞ্চল। ওই দুটি উপজেলার ২৩টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ধসে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যায়। কয়েক হাজার চিংড়িঘের ভেসে কোটি কোটি টাকার মাছ নষ্ট হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে দেড় লক্ষাধিক মানুষ। স্থানীয়দের বিরামহীন প্রচেষ্টায় এ পর্যন্ত ১৮টি পয়েন্টে সংস্কার করা সম্ভব হলেও আশাশুনির হাজরাখালী, কুড়িকাউনিয়া, চাকলা, হরিসপুরসহ আশপাশের পাঁচটি জায়গা এখনও মেরামত করা সম্ভব হয়নি। ফলে শ্রিউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রামের ওপর দিয়ে এখনও নদীর জোয়ার-ভাটা বইছে। সেনাবাহিনী ও পানি উন্নয়ন বোর্ড আম্পান পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা চেষ্টা করেও নদীর প্রবল স্রোতের কারণে হাজরাখালী, কুড়িকাউনিয়া, চাকলাসহ ধসে পড়া বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে না পারেনি। এসব জায়গা দিয়ে নদীর জোয়ার-ভাটা ওঠানামা করছে।\হশ্রিউলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হেনা সাকিল বলেন, আম্পান ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। হাজরাখালী পয়েন্টে এখনও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে আমার ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের ওপর দিয়ে জোয়ার-ভাটা চলছে। সহস্রাধিক মানুষ ছয় মাস ধরে বেড়িবাঁধ ও স্থানীয় সাইক্লোন শেল্টারে অবস্থান করছে। তারা বাড়িঘরে ফিরতে পারেনি। শুনেছি সেনাবাহিনী হাজরাখালী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য আসবে। কিন্তু এখনও পৌঁছায়নি। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, নদীর খরস্রোতের কারণে আশাশুনির কয়েকটি স্থানে ধসে পড়া বেড়িবাঁধ গত ছয় মাসেও সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার চলতি শীত মৌসুমে আশাশুনি ও শ্যামনগর অঞ্চলে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। শিগগিরই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে।\হপ্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, আমার ইউনিয়নের ১৭টি গ্রামের ওপর দিয়ে এখনও নদীর জোয়ার-ভাটা বইছে। কুড়িকাউনিয়া, চাকলা, হরিসখালী বেড়িবাঁধ গত ছয় মাসেও সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ডিসেম্ব্বরের মধ্যে যদি ধসে পড়া এসব বাঁধ সংস্কার করা না যায় তাহলে আর সম্ভব হবে না। আমরা চাই টেকসই বেড়িবাঁধ।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে ধসে পড়া বেড়িবাঁধ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। এখন শুকনো মৌসুম শুরু হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে বেড়িবাঁধের সংস্কারকাজ শুরুর চেষ্টা করছি। আশা করছি, যেসব জায়গা এখনও মেরামত বা সংস্কার করা সম্ভব হয়নি তা সংস্কার করা সম্ভব হবে।\হ

বিষয় : বেড়িবাঁধে আশাশুনির শত শত পরিবার

মন্তব্য করুন