চুক্তির ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি এখনও অধরা। চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়িত না হওয়ায় পাহাড়ে বাড়ছে হতাশা, ক্ষোভ আর হানাহানি। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা সশস্ত্র সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে জনসংহতি সমিতির তৎকালীন শান্তিবাহিনীর প্রায় দুই হাজার সদস্য সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।\হচুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত। সরকার বলছে, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৭টি বাস্তবায়িত হয়েছে। জনসংহতি সমিতির দাবি, চুক্তির মাত্র ২৪টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। অবাস্তবায়িত ধারাগুলোর মধ্যে চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো রয়েছে। পার্বত্য চুক্তির ২৩ বছরপূর্তি উপলক্ষে জনসংহতি সমিতি প্রকাশিত বুকলেটে অভিযোগ করা হয়েছে, চলতি বছরের ১১ মাসে পার্বত্য চুক্তির অধীনে গঠিত কোনো কমিটির মিটিং হয়নি। গত ৩ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানে পার্বত্য ভূমি কমিশনের সভা আহ্বান করা হলেও কোরাম সংকটের কারণে সেটিও হয়নি। চলতি বছর চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে চলমান সাধারণ ছুটি এবং অঘোষিত লকডাউনের ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি একেবারেই ধামাচাপা পড়ে গেছে।
২৩ বছরে ৪টি আঞ্চলিক দল সৃষ্টি :১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে দুটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের পাহাড়ে আধিপত্য ছিল। ১৯৯৮ সালে ইউপিডিএফ সৃষ্টি হয়। ২০০৭ সালের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জেএসএসের কেন্দ্রীয় নেতা সুধাসিন্ধু খীসা ও রূপায়ণ দেওয়ানের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা গ্রুপ) নামে অপর একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০১৭ সালে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফে ভাঙন সৃষ্টি হয়। ওই বছর ১৫ নভেম্বর তপন জ্যোতি চাকমার (বর্মা) নেতৃত্বে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। দলটির সঙ্গে জেএসএসের (এমএন লারমা) সখ্য গড়ে ওঠে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান লিবারেশন আর্মির অধীনে স্থানীয়দের নিয়ে 'মগ' পার্টি নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়।\হবাড়ছে সংঘাত, হানাহানি :পার্বত্য চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত, হানাহানি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকের অভিমত। বিশেষ করে এলাকার আধিপত্য ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে আঞ্চলিক দলগুলো। ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জেএসএসের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ইউপিডিএফ। এতে দুই পক্ষে তিন শতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়। ২০১৭ সালের\হডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই তিন বছরে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে ১১৭ জন। নিহতদের মধ্যে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা, জেএসএস (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা; ইউপিডিএফের কেন্দ্রেীয় নেতা মিঠুন চাকমাসহ বেশ কয়েকজন প্রথম সারির নেতা রয়েছেন। ইউপিডিএফের অভিযোগ- জেএসএস (এমএন লারমা) ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলকে সহায়তা দিচ্ছে।
২০১৮ সালে বান্দরবানে মগ পার্টি নামে আরেকটি দলের আবির্ভাব হয়। রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় বাঙালহালিয়ায় জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও ও মগ পার্টির মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। আগে বান্দরবান ও রাজস্থলীতে জেএসএসের (সন্তু লারমা) শক্ত অবস্থান ছিল। পরে ওই তিনটি সংগঠনের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। রাজস্থলী উপজেলা ও কাপ্তাইয়ে গত দুই বছরে সংঘাতে ১৬ জন নিহত হয়েছে। সর্বশেষ রাজস্থলী উপজেলার পোয়াইতাপাড়া ও বালুমুড়াপাড়ার মধ্যবর্তী স্থানে জেএসএস (সন্তু লারমা) ও মগ পার্টির মধ্যে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তবে কারও লাশ খুঁজে পায়নি পুলিশ। সেখান থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুইনুমং মারমা (২৫) নামে একজন মগ পার্টির সদস্যকে গুলিবিদ্ধ অবস্থ্থায় উদ্ধার করে। গত ২২ নভেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। বান্দরবানেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে গত দুই বছরে আওয়ামী লীগ, জেএসএস (এমএন লারমা) ও মগ পার্টির ১৭ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।\হরাজনৈতিক দল ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর নেতারা যা বলছেন :বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্যাঞ্চল শাখার সাধারণ সম্পাদক ইন্টুমনি তালুকদার বলেন, পার্বত্য চুক্তির দীর্ঘ ২৩ বছরে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী শান্তি দেবী তঞ্চংগ্যা বলেন, চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রতিনিয়ত জুম্ম নারীরা নানাভাবে নির্যাতন, সহিংসতা ও শ্নীলতাহানির শিকার হচ্ছেন। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।\হপ্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, ২০২০ সালে এসেও পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনতে হচ্ছে। এটা হতাশার। পার্বত্য চুক্তি হয়েছে রাজনৈতিক উদ্যোগে। সংঘাত নয়; রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান হতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, দুঃখজনক হলো, বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- চুক্তির ৯০-৯৫ ভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরুপা দেওয়ান বলেন, চুক্তির পুরোপুরি বাস্তবায়নের কথা বাদ দিলাম। মৌলিক বিষয়গুলোই বাস্তবায়ন হয়নি। যার কারণে পার্বত্যাঞ্চলের সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। তিনি বলেন, চুক্তির আলোকে ২০০১ সালে ভূমি কমিশন গঠিত হয়েছে। ২০১৬ সালে তা সংশোধন করা হলেও ভূমি কমিশন কাজই শুরু করতে পারেনি।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুছা মাতব্বর বলেন, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টিই বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চুক্তি হলেও এখনও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি থামেনি। এ কারণে চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না।\হজনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ও সাবেক এমপি উষাতন তালুকদার বলেন, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে সরকার ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহ। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি একটি পক্ষের ষড়যন্ত্র এবং যারা দেশের মঙ্গল চায় না, তাদের কারণে চুক্তি বাস্তবায়িত হতে পারছে না।

বিষয় : বাড়ছে হানাহানি ক্ষোভ হতাশা

মন্তব্য করুন