ঝুড়িভর্তি মাছ মাথায় করে বা টেনে নৌকা থেকে নামাচ্ছেন জেলেরা। কেউ দাম হাঁকছেন চিৎকার করে কিংবা গানের সুরে। একজনের মাছ বিক্রি শেষ না হতেই আরেকজন এসে হাজির। আবারও শুরু হাঁকডাক। এমন করেই শত শত জেলে বিরামহীনভাবে হাঁক ডেকে যাচ্ছেন মাছ বিক্রি করতে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ক্রেতাসহ স্থানীয়রা তাদের পছন্দমতো মাছ কিনে চলেছেন দরকষাকষি শেষে। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত এমন দৃশ্য চোখে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার নতুন মাছ বাজারে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার কারণে নাসিরনগরের এই নতুন বাজারে মাছ আসছে অন্যান্য জেলা থেকেও। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, সাফাকত, আদমপুর, হবিগঞ্জের লাখাই, মাদনাসহ উত্তরাঞ্চলের বেশকিছু হাওর এলাকা অন্যতম। হাওর ও নদীর মিঠাপানির মাছের খ্যাতি থাকায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব মাছ ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জসহ অন্যান্য নিকটবর্তী জেলায়। আড়তদারদের দাবি, প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হচ্ছে এই বাজারে।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শুভ্র সরকার সমকালকে বলেন, অল্পদিনেই এ বাজারের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে এখানে অর্ধকোটি টাকারও বেশি মাছ কেনাবেচা হচ্ছে। তিনি জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য বদরুদ্দোজা মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন সংগ্রামের উদ্যোগে ২০১৮ সালে বাজার ঘাটে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত হয় 'মৎস্য আহরণ পরিচর্যা কেন্দ্র'। মূলত একে কেন্দ্র করেই মাছের এই নতুন বাজার গড়ে উঠেছে।

শুভ্র সরকার আরও বলেন, নাসিরনগর উপজেলার হাওরবেষ্টিত চারটি ইউনিয়নে জেলে সম্প্রদায়ের প্রায় ২৫ হাজার লোকের বসবাস। এর মধ্যে নাসিরনগর সদর ইউনিয়নেই বাস করে অধিকাংশ জেলে পরিবার। ২০১৭ সালে উপজেলার গোয়ালনগর, হরিপুর, ভলাকুট ও নাসিরনগরের হাওর ও নদী মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করায় বর্তমানে জেলেরা তার সুফল পাচ্ছেন। তিনি বলেন, মাছের নতুন এই বাজারকে কেন্দ্র করে নাসিরনগরের বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে।

সরেজমিন দেখা যায়, এ বাজারে মিঠাপানি থেকে শুরু করে আমদানি করা পুকুরের মাছও পাওয়া যায়। মিঠাপানির মাছের মধ্যে রয়েছে- ট্যাংরা, চাপিলা, শোল, গজার, বাইম, কাচকি, টাকি, পুঁটি, বোয়াল, আইড়, চিতল, কালবাউশ, চিংড়ি, পাবদা, গোলশা, শিং, মাগুর ও কৈ। মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জ জেলার লাখাই, মাদনা এবং কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম, শিবপুর, আলালপুর ও সাফাকতের বিভিন্ন হাওর ও নদী থেকে মাছ নিয়ে আসা হয় স্থানীয় লঙ্গন নদীতীরবর্তী এই বাজারে।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, কম করে হলেও জেলে পল্লির প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন নতুন করে গড়ে ওঠা মৎস্য আড়তকে কেন্দ্র করে। উপজেলার মেঘনা, তিতাস, লঙ্গন, বলভদ্র, কাস্তি, বেমালিয়া নদী এবং ছোট-বড় বিভিন্ন হাওর থেকে জেলেরা সারা বছর মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেন। এ মাছ বাজারকে কেন্দ্র করে এর আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় ভ্রাম্যমাণ দোকানঘর। কেনাবেচা বেড়েছে মূল বাজারের অন্যান্য পণ্য বিক্রি-বাট্টাতেও।

বাজারের মুদি দোকানি কামরুল ইসলাম জানান, মূল বাজারের পাশে গড়ে ওঠা মৎস্য আড়তের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা কিছিমের মানুষ মাছ কিনতে আসেন। ফলে মাছের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্য বিক্রেতারাও এর সুফল ভোগ করছেন।

আশুগঞ্জ থেকে মাছ কিনতে আসা মারফত আলী সমকালকে বলেন, 'বাপ-দাদা মাছের ব্যবসা করছে। আমিও এ ব্যবসা করি। আগে আমার মতো অনেকেই আশুগঞ্জ ও ভৈরব থেকে মাছ কিনত। কিন্তু নাসিরনগরে মাছ সস্তায় পাওয়া যায়। এ এলাকার মাছও বেশ সুস্বাদু। এ বাজারে নেই দালালের দৌরাত্ম্য। তাই এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ টাকার বিভিন্ন জাতের মাছ কিনে ঢাকার যাত্রবাড়ী পাঠাই।'

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের মাছ বিক্রেতা বনবিহারী দাস জানান, প্রায় ছয় বছর ধরে ভৈরব বাজারে মাছ বিক্রি করে আসছি। ভৈরব যেতে হয় নদীপথে। প্রায় সময় ডাকাতের কবলে পড়তে হয়। নাসিরনগর আড়ত হওয়ায় আমাদের এলাকার বড় বড় ব্যবসায়ী এখন এখানেই মাছ বিক্রি করতে আসেন।

নাসিরনগর মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল দাস বলেন, এ বছর পানি বেশি হওয়ায় বিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যাচ্ছে। তাই আড়তেও মাছ আসছে বেশি। তিনি বলেন, আড়তের পাশে আরও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে ব্যবসায়ীরা অনেক উপকৃত হতেন।