পাহাড় কাটার অভিযোগে 'পছন্দের' ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করায় পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালককে হুমকি দিয়েছেন সদরের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। নিজ অফিসে ডেকে নিয়ে উপপরিচালক শওকত আরা কলিকে ১৫ দিনের মধ্যে কুমিল্লা ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেন তিনি। এর আগে উপপরিচালককে ফোন করে 'ননসেন্স' বলে গালিও দেন এমপি। একপর্যায়ে তিনি বলেন, 'কুমিল্লায় থাইকা ক্ষমতার অপব্যবহার করার কোনো সুযোগ নাই। আমার ভালোটা দেখছেন আপনে, খারাপটা তো দেখেন নাই।' এরপর তিনি আবার বলেন, 'খুব ক্ষমতা না? ...বলেন না আপনার অনেক ক্ষমতা। তালা মেরে দেব অফিসে গিয়ে আমি... বেয়াদব কোথাকার।'

দুই মিনিট ১৩ সেকেন্ডের এই কথোপকথন রেকর্ড সংরক্ষিত আছে সমকালের কাছে। কথোপকথনের বিষয়টি সমকালের কাছে স্বীকারও করেছেন এমপি বাহার। তিনি বলেন, উপপরিচালককে ভুল ধরিয়ে দিয়েছি। কথোপকথনের রেকর্ড কোথায় পেয়েছি, তাও বারবার জানতে চান তিনি।


জানা যায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তা বর্ধিতকরণের একটি প্রকল্পে এক লাখ ১৪ হাজার ৩৩০ ঘনফুট মাটি কাটার অভিযোগ ওঠে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড ও মেসার্স হক এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে। কিন্তু পাহাড় কাটার কোনো অনুমতি নেয়নি তারা। আবার সওজ বিভাগও তাদের পাহাড় কাটার বিষয়টি জানা নেই বলে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানায়। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিবেদন পাঠান কুমিল্লার উপপরিচালক। প্রতিবেদনটি হাতে পেয়ে উপপরিচালককে কল করেন এমপি বাহার। কথার একপর্যায়ে উপপরিচালককে ১০ মিনিটের মধ্যে তার অফিসে আসার নির্দেশ দেন তিনি। উপপরিচালক কিছুক্ষণ পর সহকারী পরিচালক ও পরিদর্শককে নিয়ে এমপির অফিসে যান। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনসহ অনেকের সামনে ফের খারাপ ব্যবহার করেন এমপি। 

এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শওকত আরা কলি। তিনি বলেন, 'ভাই, যা হয়েছে থাক; এ ব্যাপারে রিপোর্ট করার দরকার নেই।' তবে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, একজন আইনপ্রণেতা হয়ে বাহাউদ্দিন বাহার যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা মেনে নেওয়া যায় না। পরিবেশ অধিদপ্তর যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে আর এই অধিদপ্তর রেখে লাভ কী?


অভিযোগের ব্যাপারে জানতে গতকাল রাতে সমকালের পক্ষ থেকে কথা বলা হয় এমপি বাহারের সঙ্গে। এ সময় তিনি দুর্ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে উপপরিচালক টাকা-পয়সা না পেয়ে মনগড়া রিপোর্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ আনেন। এমপি দাবি করেন, 'উপপরিচালক উল্টাপাল্টা রিপোর্ট দিয়েছে। তাকে আমি ডেকেছিলাম। সে ভুল স্বীকার করেছে।' অফিসে তালা মেরে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। ১৫ দিনের মধ্যে কুমিল্লা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি। এমপি বলেন, 'আমার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। এসব আপনি জানেন কীভাবে? অডিও রেকর্ড আপনাকে কে দিয়েছে?' অডিও রেকর্ড শোনার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি। প্রতিবেদনে সরাসরি এমপির বিরুদ্ধে কিছু না বলার পরও তিনি কেন ক্ষিপ্ত হলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'দেশের স্বার্থে এমনটি বলেছি।' পরিবেশ অধিদপ্তর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমপির মালিকানাধীন বলে জানালেও এমপি তা অস্বীকার করেন।


দুই মিনিট ১৩ সেকেন্ডের সেই কথোপকথন
ডিডি :হ্যালো স্যার, ডিডি পরিবেশ অধিদপ্তর
এমপি : হ্যাঁ, আপনি যে রিপোর্টটা দিলেন...
ডিডি :স্যার।
এমপি :আপনি যে রিপোর্টটা দিলেন, আপনি আমার সাথে কথা বলেছিলেন? ওই যে লালমাই রাস্তা নিয়ে
ডিডি :জি স্যার, জি স্যার।
এমপি :রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে নিয়ে দেননি কেন? রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের বিরুদ্ধে লেখেন নাই কেন? আমাদের বিরুদ্ধে লিখলেন কেন?
ডিডি : না না, আমাদের রিপোর্টে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের বিরুদ্ধেও লেখা হয়েছে স্যার...
এমপি :না না, লেখেননি, আপনার রিপোর্টটা আমার হাতে আছে, আপনার রিপোর্টের ভিত্তিতে আপনি বলেছেন, আমরা এক লাখ ১৪ হাজার ৩৩০ ঘনফুট মাটি কেটে ফেলছি, এই মেজারমেন্টটা আপনি কীভাবে করলেন আমাকে ছাড়া?
ডিডি :স্যার আমরা মেজারমেন্ট স্যার...
এমপি :আপনি কীভাবে করলেন আমাকে ছাড়া? আমি তো একটা পক্ষ, আপনি একটা পক্ষ
ডিডি :স্যার...।
এমপি :আমি ছাড়া আপনি এককভাবে মেজারমেন্ট করলেন কীভাবে? আমার সিগনেচার নেবেন না? ক্ষমতার অপব্যবহার করতেছেন আপনি।
ডিডি :স্যার...।
এমপি :কুমিল্লায় থাইকা ক্ষমতার অপব্যবহার করার কোনো সুযোগ নাই, আমার ভালোটা দেখছেন আপনে, খারাপটা তো দেখেন নাই।
ডিডি :স্যার...।
এমপি :স্যার কী? ননসেন্স কোথাকার? আপনি এটা মেজারমেন্ট করার সময় তো আমাকে রাখতে হবে। আপনি কতটুকু কাটছেন, এটা তো একসাথে মেজারমেন্ট করতে হবে।
ডিডি :স্যার...।
এমপি :খুব ক্ষমতা না? ...বলেন না আপনার অনেক ক্ষমতা। তালা মেরে দেব অফিসে গিয়ে আমি...বেয়াদব কোথাকার।
ডিডি :না স্যার...।
এমপি :আপনি আমার অফিসে আসেন, ১০ মিনিটের মধ্যে আপনি আমার অফিসে আসেন, কি বলছি বুঝছেন?
ডিডি :কখন আসব আজকে স্যার...
এমপি :১০ মিনিটের মধ্যে আসেন, ১০ মিনিট সময় দিলাম, ১০ মিনিট।


যা আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে
কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর স্কুলপাড়া এলাকায় পিপুলিয়া-লোলবাড়িয়া-রতনপুর-চন্ডীপুরা-মগবাড়ি সড়ক প্রকল্পে রাস্তা প্রশস্তকরণ কাজে কাটা পাহাড়ের স্থানটি গত ১১ নভেম্বর সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনকালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড ও মেসার্স হক এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইমামুজ্জামান চৌধুরীসহ তিন-চারজন উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ওই রাস্তাটি ১৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা আগে ৩ দশমিক ৭ মিটার প্রশস্ত ছিল। বর্তমান প্রকল্পে মূল রাস্তাটি ৫ দশমিক ৫ মিটার পিচ ঢালাই প্রশস্ত করাসহ দুই পাশে আরও এক দশমিক ২ মিটার হার্ড সলিং করে বর্ধিত করা হবে। রাস্তাটির আনুমানিক সাত কিলোমিটার অংশে প্রস্তাবিত বর্ধিতাংশের বাইরে প্রায় ৭৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের কোথাও ৩-৭ ফুট, কোথাও ১০-১৪ ফুট গভীরতায় ৫ থেকে ৫০ ফুট উঁচু পাহাড় কাটা হয়েছে। কাটা পাহাড়ের অবশিষ্টাংশে বিভিন্ন লতাগুল্ম ও ছোটবড় বৃক্ষ দেখা যায়। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটায় কোনো কোনো অংশে পাহাড়ি গাছপালাসহ মাটি ধ্বসে পড়তে দেখা যায়। এই হিসাবে ওই প্রকল্পের কাজে আনুমানিক ৭৫০ দৈর্ঘ্যে আনুমানিক ৭ দশমিক ৪ ফুট গভীরতায় ও আনুমানিক ২০ দশমিক ৬ ফুট উচ্চতায় সর্বমোট এক লাখ ১৪ হাজার ৩৩০ ঘনফুট পাহাড় কাটা হয়েছে। অথচ এই প্রকল্পের অনুকূলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কোনো ইআইএ করা হয়নি। ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সক্যাভেটর দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে খাড়াভাবে পাহাড় কেটেছে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে এমন পাহাড় কাটায় পাহাড় ধসের দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। প্রকল্পের সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তরিক হলে পাহাড়টি রক্ষা করে কাজ সম্পন্ন করা যেত। এ ক্ষেত্রে সওজের চরম উদাসীনতা ও নজরদারির অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এভাবে পাহাড় কাটায় পরিবেশ ও প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা কোনোভাবেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর ৬(খ) ও ১২ ধারা লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে পাহাড় কাটার অপরাধে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট মামলার রুজুর সুপারিশ করা হলো।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি যা বললেন
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ইমামুজ্জামান চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, তিন ফুট গভীরতায় বক্স কাটতে গিয়ে কিছু পাহাড় ধসে পড়েছে। পাহাড় কাটা হয়নি। ওই পাহাড়ের মাটি রাস্তার কাজেই ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, প্রকল্পের প্রয়োজনে পাহাড় কাটার বিষয়টি তারা জানেন না।



বিষয় : বাহাউদ্দিন বাহার

মন্তব্য করুন