ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

তিন বন্ধুর ‘দেয়াল’

সাহস

তিন বন্ধুর  ‘দেয়াল’

অপহরণকারীদের হাত থেকে বন্ধুকে বাঁচানো তিন সহপাঠী মনিরা, আরিফা ও সারোয়ার -সমকাল

হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১০:৪৬

মনিরা, আরিফা ও সারোয়ার। তারা স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো সাধারণ ঘরের অসাধারণ তিন যোদ্ধা। অপহরণকারীদের হাত থেকে সহপাঠীকে বাঁচাতে তারা গড়ে তুলেছিল ‘দেয়াল’।

ফরিদপুর শহরতলির কোমরপুর– ছিমছাম ছবির মতো গ্রাম। ওই গ্রামের ৬০০ ছেলেমেয়ের বিদ্যাপীঠ আবদুল আজিজ ইনস্টিটিউশন। গত সোমবার সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে এসএসসি পরীক্ষার্থী সুচন্দা গোস্বামীর সামনে মাইক্রোবাসসহ এসে দাঁড়ায় অপহরণকারী দল। শক্তিধর চার দুর্বৃত্তকে বাধা দেবে– এমন সাধ্য কার! সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাহসটা দেখিয়েই দিল তিন খুদে যোদ্ধা। দুর্বৃত্তদের একের পর এক কিল, চড়, লাথি, ঘুসি হজম করেও সুচন্দাকে আঁকড়ে ছিল তিন বন্ধু।

পরে স্থানীয় জনতা অপহরণকারীদের ধরে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দেয়। তবে কৌশলে পালিয়ে যায় অপহরণের ছক তৈরির কারিগর বিধান পোদ্দার। স্কুলের পাশের গ্রাম বাহিরদিয়া। সেখান থেকে তিন বন্ধু মনিরা, আরিফা ও সুচন্দা নিত্যদিন একসঙ্গে অটোরিকশা চেপে আসে স্কুলে। বন্ধুকে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পেরে এখন মহাখুশি আরিফা ও মনিরা। দু’জনই কৃষক ঘরের সন্তান। যখন দুর্বৃত্তরা মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন মনিরাই প্রথম সুচন্দার হাত টেনে ধরেছিল। ওই সময় দুর্বৃত্তরা দু’জনকেই গাড়িতে তুলে ফেলেছিল। সেটা দেখে চিৎকার করেছিল আরিফা, আর দৌড়ে এসেছিল আরেক বন্ধু সারোয়ার মোল্লা। অপহরণকারীরা সারোয়ারকে লাঠির আঘাত করে, দেয় কিল-ঘুষি। ততক্ষণে লোকজন জড়ো হয়ে তিনজনকে আটক করে পুলিশে দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা জ্বালিয়ে দেয় অপহরণের কাজে আসা মাইক্রোবাসটি।

হঠাৎ এমন কাণ্ডে অবাক সুচন্দা। সাহসী তিন বন্ধু এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, তারা এ রকম অসম্ভব একটি কাজ সম্ভব করেছে। সাহসী মনিরা জানিয়েছে, বড় হয়ে সে পুলিশ কর্মকর্তা হতে চায়, আর কর্মজীবনের সূত্র ধরে এভাবেই দাঁড়াতে চায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে। মনিরার বাবা মাজেদ কবিরাজ সাদাসিধে মানুষ। মেয়ের এমন সাহসী কাজে গর্বিত তিনি। অপহরণকাণ্ডের দলনায়ক বিধান স্থানীয় ব্যবসায়ী। সুচন্দাকে ছয় মাস ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছে সে। সুচন্দার বান্ধবী আরিফা জানায়, পথেঘাটে উত্ত্যক্ত করার পাশাপাশি তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল বিধান। আরিফা জানায়, বড় হয়ে সেবিকা হতে চায় সে, চালিয়ে যেতে চায় মানুষের জন্য সেবামূলক কিছু করার প্রচেষ্টা। তার মা-বাবা এ ঘটনায় তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। বন্ধু সুচন্দার মাকে ছোটবেলা থেকেই খালা ডাকে সারোয়ার। করিতকর্মা হিসেবে সবার কাছে বেশ প্রিয় সারোয়ার। প্রতিবাদী হিসেবেও কম না। বাবা একটি প্রাইভেট কোম্পানির গাড়িচালক। স্কুলের পাশে কোমরপুর বাজারেই তার বাড়ি। অন্যায়-অনিয়মের প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ানোর ঘটনা এটি তার জীবনে প্রথম নয়, এর আগেও কোমরপুরে একটি মেয়েকে রিকশা থেকে ফেলে রাস্তার ওপর মেরে ফেলতে চেয়েছিল এক যুবক। সারোয়ার ওই মেয়েটিকে উদ্ধার করে নিজের বাসায় নিয়ে রেখেছিল। পরে পরিবারের লোকজন এসে মেয়েটিকে নিয়ে যান।

সুচন্দা ও তার তিন বন্ধুর অভিন্ন দাবি, ‘শয়তান বিধানের শাস্তি চাই, ওকে এমন শাস্তি দেওয়া হোক, যেন আর কোনো দুর্বৃত্ত কোনো মেয়েকে এভাবে তুলে নেওয়ার সাহস না করে।’ এ ব্যাপারে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ওসি এম এ জলিল বলেন, সুচন্দার বাবা অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। অপহরণকারী দলের তিনজন এখন জেলহাজতে আছে। মূল আসামি বিধানকে ধরতে অভিযান চলছে।

আরও পড়ুন

×