ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

বর্তমান ও সাবেক এমপির বিরোধে অধ্যক্ষ অপহরণ

বর্তমান ও সাবেক এমপির বিরোধে অধ্যক্ষ অপহরণ

সৈয়দ করম আলী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান

রাজশাহী ব্যুরো

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ২১:৫৩ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৩ | ২১:৫৩

মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে অপহরণ করে তুলে আনার ঘটনায় পুঠিয়া থানায় মামলার জন্য এজাহার জমা দিয়েছেন বিড়ালদহ সৈয়দ করম আলী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান। সোমবার রাতে তিনি নিজেই বাদী হয়ে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ এনে এজাহারটি থানায় দাখিল করেন।

এতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজশাহী-৫ আসনের এমপি ডা. মনসুর রহমানের হুকুমে এবং তাঁর হুমকির পরদিন সন্ত্রাসী কায়দায় সাত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁকে মাইক্রোবাসে অপহরণ করে এমপির বাড়িতে আটকে রাখেন।

এদিকে গুরুতর এই অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড না করে পুলিশ বলছে, এমপিকে আসামি করায় এ বিষয়টি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা যাবে কিনা, তা দেখা হচ্ছে। তবে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক ও বর্তমান দুই এমপির বিরোধের জেরে এ অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, এমপির হুমকির পর সোমবার মাদ্রাসায় বিড়ালদহের আবুল হোসেনের ছেলে মাইনুল ইসলাম মোহিন, কাদ্রার কালামের ছেলে শরিফুল ইসলাম ডাবলু, বিড়ালদহের মৃত আনছারের ছেলে তুষার, পলাশবাড়ীর রশীদের ছেলে রহমান, মাইপাড়ার মজিদ দফাদারের ছেলে হুমায়ন ওরফে হুমা, খুটিপাড়ার মান্নানের ছেলে বাবলু রহমান ও নয়াপাড়ার হযরত আলীর ছেলে কামাল হোসেন সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে অবৈধভাবে সশস্ত্রভাবে মাদ্রাসায় অনুপ্রবেশ করে। তারা মাদ্রাসার মূল ফটকে মাইক্রোবাসটি রেখে পিস্তল, চাকু, চাপাতি ও চায়নিজ কুড়াল নিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়। ত্রাস সৃষ্টি করে অধ্যক্ষের অফিসে ঢুকে ঘিরে ধরে। কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, ‘এমপি ডা. মনসুর রহমানের হুকুম আপনাকে তুলে নিয়ে যেতে হবে। যদি কেউ বাধা প্রদান করে, তবে তার লাশ ফেলে দেওয়া হবে।’ এ সময় অধ্যক্ষ প্রতিরোধ করতে চাইলে তাঁর মাথায় আসামি মোহিন ও ডাবলু পিস্তল ঠেকায়। অন্য আসামিরা শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের সামনে তাঁকে লাঞ্ছিত করে। এ সময় প্রভাষক ইসতিয়াক আহমেদ ও পিয়ন আজিজুল হক তাঁকে বাঁচাতে এলে আসামিরা তাদেরও মারধর করে। এ সময় অস্ত্রের মুখে মারধর করে মাইক্রোবাসে অধ্যক্ষকে তুলে নিয়ে যায়। মারধরের সময় অধ্যক্ষের মোবাইল ফোনটিও তারা কেড়ে নেয়। এ সময় তিনি জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফিরে দেখেন এমপি ডা. মনসুরের বাড়িতে তাঁকে আটকে রাখা হয়েছে। আটকের কারণ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ হাবিবুরকে এমপি ডা. মনসুর রহমান জানান, মাদ্রাসায় কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তাঁর ইচ্ছামতো নিয়োগ ও গভর্নিং বডি করতে হবে। 

এ সময় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পুঠিয়া থানা পুলিশ অধ্যক্ষকে এমপির বাসভবন থেকে উদ্ধার করে মাদ্রাসায় নিয়ে আসে। 

তবে এজাহারটি সোমবার রাতে জমা দিলেও মামলা হিসেবে রেকর্ড করেনি পুলিশ। অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, অভিযোগ দিয়েছি সোমবার রাতে। তবে কেন রেকর্ড করেনি, তা জানি না। আমাকে রিসিভ কপি দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি। 

পুঠিয়া থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, এজাহারটি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে সাতজনকে আসামি এবং হুকুমের আসামি হিসেবে এমপির নাম রয়েছে। এ কারণে এজাহারটি মামলা হিসেবে এখনও রেকর্ড করা হয়নি। তবে মামলা হিসেবে নিতে কোনো বাধা আছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। যদি কোনো বাধা না থাকে, তবে মামলাটি রেকর্ড করা হবে। 

স্থানীয়রা জানান, রাজশাহী-৫ আসনের সাবেক এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুল ওয়াদুদ দারার বাড়ি পুঠিয়ার বিড়ালদহ গ্রামে। নিজ গ্রামের মাদ্রাসা হওয়ায় এটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এমনটি আশা ছিল তাঁর। তবে বর্তমান এমপি মনসুর রহমান চেয়েছেন মাদ্রাসাটি তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকুক। এ কারণে তিনি এই এলাকার বাসিন্দা রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলীকে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি করেন। মেয়াদ শেষে আবারও তাঁকে সভাপতি রাখতে ডিও দেন। এ ছাড়া মাদ্রাসা অধ্যক্ষের ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আত্মসাতের বিষয়টি ধরে ফেলে তাঁকে সেই টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দেন নওশাদ। এ কারণে অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান গোপনে চেয়েছেন তাঁর অনুগত কাউকে সভাপতি করতে। এজন্য তিনি কাজী আব্দুল ওয়াদুদ দারার সমর্থন এবং তাঁর অনুগত আব্দুস সালেককে তিনি গোপনে সভাপতি করেন। ডিও লেটারকে অসম্মান করায় ক্ষুব্ধ হন এমপি মনসুর। 

মাদ্রাসাটির একাধিক সূত্র জানায়, এমপি চেয়েছিলেন ডা. নওশাদের মাধ্যমে মাদ্রাসার বেশ কিছু নিয়োগ করে নিতে। কিন্তু অধ্যক্ষ চেয়েছিলেন নিজের মতো করে নিয়োগ শেষ করতে। এ কারণে তিনি এমপিকে এড়িয়ে চলেন। এর জের ধরেই এমপি ক্ষুব্ধ হয়ে তুলে আনার হুমকি দেন।

এমপি ডা. মনসুর রহমান সমকালকে বলেন, অধ্যক্ষ হাবিবুরকে আমি তুলে আনিনি। মাদ্রাসার অচলাবস্থা নিয়ে কথা বলতে ডেকেছিলাম। কিন্তু সাবেক এমপি দারার কারসাজিতে এসব চক্রান্ত সাজানো হয়েছে। অধ্যক্ষ আমার বাড়িতে এসে বলেছেন, খিদা লেগেছে খেতে দেন। আমি তাঁকে মিষ্টি খাইয়েছি। সেই ভিডিও আছে। ভাইরাল হয়েছে।

বর্তমান এমপির অভিযোগ বিষয়ে জানতে সাবেক এমপি কাজী আব্দুল ওয়াদুদ দারা বলেন, আমি এগুলোর কিছুই জানতাম না। আমার বিরুদ্ধে অকারণেই অভিযোগ করছেন তিনি।

আরও পড়ুন

×