ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

স্মৃতিস্তম্ভে বাড়িয়া গণহত্যার ভয়াবহতা

মুক্তিযুদ্ধ

স্মৃতিস্তম্ভে বাড়িয়া  গণহত্যার ভয়াবহতা

পাকিস্তানিদের হাতে নিহতদের স্মরণে গাজীপুরের বাড়িয়ায় নির্মিত ভাস্কর্য -সমকাল

ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন, গাজীপুর

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৩ | ০৬:৫২

গাজীপুর শহর থেকে ৮-১০ কিলোমিটার পূর্বে বোলাই বিলবেষ্টিত হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম বাড়িয়া। ১৯৭১ সালের ১৪ মে গ্রামের তিন দিকেই থইথই করছে বর্ষার পানি। কে জানত সেদিন দুপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে নিভৃত এই গ্রাম পরিণত হবে শ্মশানে। পাকিস্তানি সেনাদের ব্রাশফায়ারে সেদিন বাড়িয়ায় ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া প্রাণহীন অসংখ্য মৃতদেহ পড়ে ছিল জলে ও স্থলে। কোথাও নিথর মায়ের কোলে রক্তমাখা নিস্তব্ধ সন্তান, কোথাও আবার বাবার কাঁধে পুত্রের ক্ষতবিক্ষত লাশ। ইতিহাসে এই হত্যাযজ্ঞ বাড়িয়া গণহত্যা নামে পরিচিত। এই গণহত্যায় বাড়িয়া এবং নিকটবর্তী কামারিয়া থেকে ধরে এনে প্রায় ২০০ বাঙালি হিন্দুকে হত্যা করা হয়। আহত হন আরও কয়েক শতাধিক।

স্বাধীনতা লাভের ৫২ বছর কেটে গেলেও নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞে শহীদদের স্মরণে বাড়িয়াতে ছিল না কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। প্রজন্মের এই দায় অবশেষে মোচন করেছেন বাড়িয়া গ্রামেরই সন্তান ভাস্কর কুয়াশা বিন্দু। একাত্তরে বিধ্বস্ত সেই বাড়িয়ার নিদারুণ গল্প তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ‘বাড়িয়া গণহত্যা’ শীর্ষক ভাস্কর্যে। কুয়াশা জানান, একাত্তরের ১৪ মে তাঁর পিতামহ সয়দেব চন্দ্র দাসকেও হত্যা করে পাকিস্তানিরা। মানুষের রক্তে সেদিন লাল হয়ে গিয়েছিল বোলাই বিলের পানি। নিদারুণ যন্ত্রণার সে দিনটি স্মরণ করে প্রজন্মের দায় মোচনে সব আবেগ, দরদ আর ভালোবাসা ঢেলে তিনি এই ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। ভাস্কর্যটি এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। গত ১৯ অক্টোবর উদ্বোধনের কথা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী ব্যস্ত থাকায় তা হয়নি। এখন তারা অপেক্ষা করছেন ভাস্কর্য উদ্বোধনের নতুন দিন জানার জন্য। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রায় ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে এ ভার্স্কয নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। কুয়াশা বিন্দু জানান, বাড়িয়া গ্রামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য অনেকেই চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা বিজয় দাস ছিলেন অন্যতম। ২০২১ সালে গাজীপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বাড়িয়া গ্রামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে এগিয়ে আসেন। ওই বছরের ২৫ আগস্ট এর কাজ শুরু হয়। মূল বেদি থেকে ১৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৮ ফুট প্রস্থের এ ভাস্কর্যের উচ্চতা ১৭ ফুট। জলাধারের মাঝখানে নৌকা আকৃতির একটি পাথরের বেদির ওপর ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ২৮ জন শহীদের অবয়ব।

১৯৭১ সালের ১৪ মে দিনটি ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজের সময় বাড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুই শতাধিক সদস্য। হঠাৎ শুরু হয় ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। আতঙ্কে দিশেহারা মানুষ আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যেতে থাকেন বেলাই বিলের পাড়ের জয়রাম বেড়, বড় কয়ের, বক্তারপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে। অসংখ্য মানুষ সাঁতরে ও নৌকায় চড়ে বিল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা কাউকে ছাড়েনি। তাদের ব্রাশফায়ারে সেদিন শুধু বাড়িয়া গ্রামেই মারা যান দুই শতাধিক মানুষ। যুদ্ধের জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে বাড়িয়া গ্রামে আশ্রয় নেওয়া আরও ৫২ জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুধু মানুষ হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি বর্বররা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় প্রত্যেকটি বাড়ি।

বাড়িয়া গণহত্যায় কতজন নারী-পুরুষ ও শিশু শহীদ হয়েছেন তার সঠিক তথ্য এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে সেই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ভাওয়াল বাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক যতীন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন, জয়দেবপুরের শ্রীনিবাস ভৌমিকের কাছে গ্রামে নিহতদের একটা তালিকা ছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুর সময়কালে ত্রাণ কমিটির সম্পাদক ছিলেন। তাঁর তালিকায় ১৫১ জন শহীদের নাম দেখেছিলাম।

আরও পড়ুন

×