ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

মাছের ‘রাজ্য’ ডুমুরিয়া

মাছের ‘রাজ্য’ ডুমুরিয়া

ডুমুরিয়ার হাসানপুর ওয়াবদার বিলে মাছ ধরছেন জেলেরা। সম্প্রতি তোলা ছবি -সমকাল

এম এ এরশাদ, ডুমুরিয়া (খুলনা)

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:২৩

খুলনা শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক ঘেঁষে ডুমুরিয়া উপজেলা। এলাকায় ১৩টি পাইকারি বাজার গড়ে উঠেছে। উপজেলা সদরে দুটি এবং বিভিন্ন বাজারসহ গ্রামীণ সড়ক ঘেঁষে এসব স্থানে মাছ কেনাবেচা চলছে। বাজারগুলোয় গত মৌসুমে প্রায় সাড়ে ১৩শ’ কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ৩৬ হাজার নারী-পুরুষের। ১৭ বছরে মাছ উৎপাদনের ‘রাজ্য’ হয়ে উঠেছে উপজেলাটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়ার ২২৬টি গ্রামেই মাছ চাষ হচ্ছে। গলদা ও বাগদা চিংড়ি এবং কার্পজাতীয় মাছ চাষ হচ্ছে বেশি। বিল এলাকায় রয়েছে অসংখ্য ঘের। চিংড়ির সঙ্গে মিশ্র বা আলাদাভাবে নানা প্রজাতির মাছ চাষ করছেন চাষিরা। উপজেলায় ২৮ হাজার ৫৭৪ জন চাষি রয়েছেন। তুলনামূলক কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় তারা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

উপজেলার ওয়াবদার বিলে ২১ বিঘা জমিতে পাঁচটি ঘের রয়েছে হাসানপুর গ্রামের তবিবুর রহমান জোয়ার্দারের। চিংড়িসহ কার্পজাতীয় মাছ চাষ করেন তিনি। বাগদা চাষে ১০ লাখ টাকা খরচে প্রায় ১৯ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। অন্য মাছে খরচ হয়েছে ৯ লাখ টাকা। বিক্রি করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা লাভ করেছেন। তিনি বলেন, ফড়িয়ারা বাজারে নগদ টাকায় মাছ কেনেন। চাষিদের বাড়তি খরচ হয় না।
শুধু তাই নয়, এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হয়েছে। খর্নিয়া গ্রামের ভ্যানচালক হাবিবুর রহমান ও মলয় বিশ্বাস জানান, বিল এলাকা থেকে তারা মাছ পরিবহন করে দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন। অন্তত সাড়ে সাত হাজার ভ্যানচালক ও শ্রমিক এতে নিয়োজিত। মাগুরখালী গ্রামের পংকজ কুমার ও রংপুর গ্রামের লালন মণ্ডল ঘের পাহারা দেন। খাওয়াসহ মাসে সাড়ে ৮ হাজার টাকা পান। এমন কর্মচারীর সংখ্যা অন্তত ২৫ হাজার বলে দাবি তাদের।

মৎস্য বিভাগ থেকে জানা গেছে, সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিল, খাল, পুকুর ও ডোবায় ২২ হাজার ১৮৪ হেক্টর জমিতে মাছ চাষ হচ্ছে। বাগদা ৬ হাজার ৭৮১ হেক্টর, গলদা ১১ হাজার ১৪৬ এবং ৪ হাজার ২৫৭ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হচ্ছে কার্প মাছ। আগের মৌসুমে ১৮ হাজার ৭১২টি ঘেরে উৎপাদন হয়েছে ৭ হাজার ৫৭৮ টন গলদা। বিক্রি হয়েছে ৬০৬ কোটি ২৪ লাখ টাকায়।
৭ হাজার ৮১০টি ঘেরে বাগদা উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৬১২ টন। বেচাকেনা হয়েছে ২৩৫ কোটি ৮ লাখ টাকায়। হরিণা (ছোট চিংড়ি) ১৪ কোটি ৫০ লাখ, কার্প ৪০৫ কোটি ৫০ লাখ এবং অন্য মাছ ৭৫ কোটি টাকার বিক্রি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ঘের প্রস্তুত করে চাষের উপযোগী করা হয়। চাষি ও ফড়িয়াদের নিরাপদে কেনাবেচা করতে বাজার কমিটি কড়া নজরদারির ব্যবস্থা রাখেন। 
২০২০ সালে উৎপাদন হয় প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ১৮ হাজার ১২৮ টন মাছ। এক দশক আগে ২০১৩ সালে উৎপাদন হয়েছিল ১০ হাজার ৩১৮ টন মাছ, যার দাম ছিল প্রায় ৬২৮ কোটি টাকা। তবে ২০২২-২৩ মৌসুম চলমান থাকায় এখনও উৎপাদন ও বিক্রির হিসাব করেনি মৎস্য বিভাগ।

ঢাকা থেকে আসা ফড়িয়া আমিনুল ইসলাম জানান, বাগদা চিংড়ি প্রতি কেজি ৯০০ টাকা, গলদা ৮০০, হরিণা ৫০০ এবং কার্পজাতীয় মাছ ২৭৫ থেকে ৫০০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। জিলেডাঙ্গা গ্রামের সুভেন্দু বিশ্বাসের ভাষ্য, চার বিঘা জমিতে মাছ চাষ করেন তিনি। ৩ লাখ টাকা খরচ করে বিক্রি করেছেন সাড়ে ৫ লাখ টাকার মাছ।
উপজেলা খর্নিয়া মৎস্য বাজারের সভাপতি শেখ রবিউল ইসলাম রবি বলছিলেন, ১৩টি পাইকারি বাজারে অন্তত সাড়ে তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে চিংড়িসহ ভেটকি, রুই-কাতলা, পারশে ও পাবদা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। এলাকায় চাহিদা মিটিয়ে মাছ যাচ্ছে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রংপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায়। বরফের জোগান দিতে তিনটি মিলও গড়ে উঠেছে।

উপজেলায় মাছ চাষি ও ঘেরের সংখ্যা বাড়ছে জানিয়ে জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহসভাপতি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহাবুব উল-ইসলাম বলেন, এলাকায় মাছ চাষে বিপ্লব ঘটেছে। বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
উপজেলায় সাড়ে ১৩শ’ কোটি টাকার মাছ বেচাকেনার তথ্য নিশ্চিত করে মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, অল্প জমিতে অধিক মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে ১৭৫ জন চাষিকে ২ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার চাষিকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পাশাপাশি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
 

আরও পড়ুন

×