ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার পর বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আনতে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। শতাধিক ব্যবসায়ীর শতকোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে এবার। চার কারণে স্মরণকালের সর্বোচ্চ ক্ষতির মুখোমুখি তারা। বাজার পরিস্থিতি না বুঝে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মাত্রাতিরিক্ত এলসি খোলা, সময় মতো এলসি পণ্য দেশে আনতে না পারা, বিক্রির তুলনায় আমদানি খরচ বেশি হওয়া এবং ভারত ফের রপ্তানি শুরু করা- এই চার কারণে ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। ফলে দেশে আসার পরও এখন আর পেঁয়াজ বন্দর থেকে খালাস করছেন না তারা।

চট্টগ্রাম বন্দরে এক মাস ধরে ৯০ কোটি টাকার প্রায় ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ পড়ে আছে। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও এসব পেঁয়াজ খালাসে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না আমদানিকারকরা। এদিকে সাড়ে তিন মাস বন্ধ রাখার পর শনিবার থেকে ফের বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি শুরু করেছে ভারত। ভারত থেকে আমদানি ব্যয় তুলনামূলক কম। ফলে ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে আমদানি পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারত রপ্তানি বন্ধের পর পেঁয়াজের নতুন বাজার ধরতে মাঠে নেমেছিলেন প্রায় ৬০০ ব্যবসায়ী। এ তালিকায় বড় শিল্প গ্রুপের পাশাপাশি মৌসুমি ছোট ব্যবসায়ীরাও ছিলেন। ভারতের বিকল্প দেশ থেকে সাত লাখ টন পেঁয়াজ আনতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন এই ব্যবসায়ীরা। তবে অনুমতিপত্র নেওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে এলসি খুলেছেন প্রায় অর্ধেক ব্যবসায়ী। বাজার স্থিতিশীল করতে তখন পেঁয়াজ আমদানির ওপর নির্ধারিত ৫ শতাংশ শুল্ক্কের পুরোটাই প্রত্যাহার করে নিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। এই সুযোগ নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। ভারতের বিকল্প দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ড, চীন, মিসর, তুরস্ক, মিয়ানমার, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ইউক্রেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তান থেকে বেশি পেঁয়াজ আনার অনুমতিপত্র নিয়েছিলেন তারা। তবে এর আগে মিয়ানমার, পাকিস্তান, চীন, তুরস্ক ও মিসরের দিকেই নজর ছিল ব্যবসায়ীদের।

আমদানির বেশিরভাগ পেঁয়াজ জাহাজে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনটেইনারে সমুদ্রপথে আনতে হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে।

এতে করে খরচও বেড়ে গেছে। আবার সময়মতো আনতে না পারায় লাভ ধরতে পারছেন না তারা। করোনার কারণে রপ্তানি শিডিউল এলোমেলো ছিল বিদেশেও। অনভিজ্ঞ অনেক প্রতিষ্ঠান এলসি খুলেছে দেরিতে। বাজার পর্যবেক্ষণ করে এলসি খুলতে গিয়ে যারা সময় নিয়েছে, এখন বেশি লোকসান গুনছে তারাই।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, 'পেঁয়াজের চাহিদা ও মজুদের তথ্য ভালোভাবে বুঝে এলসি খোলা উচিত ছিল। নতুন ব্যবসায়ীরা এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করেননি। বাজারে যে সংকট ছিল, তা কত দিন থাকবে, এই মুহূর্তে কত পণ্য মজুদ আছে, আর কত চাহিদা আছে, ভারত কখন বাজার উন্মুক্ত করবে- এগুলো যারা হিসাবে আনেননি, তারা এখন ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আনতে খরচও অনেক বেশি পড়ে।'

খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, 'ভারতের বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ এনে অনেক ব্যবসায়ী এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছেন। ৯০ কোটি টাকার পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আর খালাস করছেন না তারা। আমদানি খরচের চেয়ে অনেক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম এখন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। অথচ বন্দর পর্যন্ত আনতে প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে ৪০ টাকারও বেশি। ভারত ফের রপ্তানি শুরু করায় পেঁয়াজের দাম আরও পড়ে যাবে। না বুঝে যারা এলসি খুলেছেন, তারা এখন কাঁদছেন।'

নতুন বাজার ধরতে তৎপর ৬০০ ব্যবসায়ীর বেশিরভাগই অনভিজ্ঞ: ২০১৯ সালে প্রায় ৬০০ ব্যবসায়ী সাত লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছিলেন। এর মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন দুই শতাধিক ব্যবসায়ী। সাড়ে ৮০০ চালানে এসব পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আনার কথা ছিল। এই ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই এ ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ।

পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- রেড লিঙ্ক মিসর থেকে এক হাজার মেট্রিক টন, পাকিস্তান থেকে এএস করপোরেশন ৫০১ মেট্রিক টন, মিয়ানমার থেকে এসএন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ৫০০ মেট্রিক টন, এএইচ এন্টারপ্রাইজ চীন থেকে ৫০০ মেট্রিক টন ও মিয়ানমার থেকে ৫০০ মেট্রিক টন, চীন থেকে এ মোক্তার ট্রেডিং ৫০০ মেট্রিক টন, মিয়ানমার থেকে খাতুনগঞ্জ ট্রেডিং ৫০০ মেট্রিক টন, পাকিস্তান থেকে এস ইসলাম ট্রেডিং ৪০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি করেন।

এস আলম গ্রুপের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক কাজী সালাহউদ্দিন আহাম্মদ বলেন, 'মিসর ও তুরস্ক থেকে পণ্য আনতে গিয়ে গতবার অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। এবার পেঁয়াজের প্রথম চালান নেদারল্যান্ডস থেকে এনেছি আমরা। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে আরও ৮০ হাজার টন পেঁয়াজ আনার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। পরে সেখান থেকে সরে এসেছি।'

চিঠি দিয়ে সাড়া পাচ্ছে না চট্টগ্রাম বন্দর: চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক জানান, গত শুক্রবার চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দুই লাখ ১০ হাজার টন পেঁয়াজ ছাড় হয়েছে। এখনও প্রায় ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ বন্দর ইয়ার্ডে পড়ে আছে। পেঁয়াজ আমদানির সঙ্গে সম্পৃক্ত শিপিং লাইন, শিপিং এজেন্ট, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের গত এক মাসে পণ্য খালাস করে নিতে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বন্দরে নামার ৪৫ দিন পার হয়ে গেলে এসব পেঁয়াজ নিলামে তুলতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বলা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।