কলেজপড়ূয়া ছেলেটির সঙ্গে দেড় মাস আগে দেখা হয় স্কুলপড়ূয়া মেয়েটির। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকার একই বাড়ির ভাড়াটিয়া তারা। পরিচয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই সজল শেখ নামের ওই ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ষষ্ঠ শ্রেণির ওই ছাত্রীর। এ সম্পর্কের কথা জেনে যায় মেয়েটির পরিবার। এরপর সজলের পরিবারের সদস্যদের নানা ভাষায় অপমান করে তারা। এর জেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সজল। এ ঘটনায় সজলের কিছু হলে মামলা দিয়ে মেয়েটি ও তার মা-বাবাকে জেল খাটানো হবে বলে হুমকি দেন সজলের ফুপু লাভলী আক্তার। এর পরই সজলকে সিরাজগঞ্জের দত্তবাড়ির গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন পরিবারের লোকজন। সজল সেখানকারই একটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। করোনার কারণে কলেজ বন্ধ থাকায় কালিয়াকৈরে ভাই ও ফুপুর বাসায় থাকত।

এদিকে, গত ২ জানুয়ারি নিখোঁজ হয় মেয়েটি। সে দিনই তাকে অপহরণের অভিযোগে সজল ও তার ফুপু লাভলীর বিরুদ্ধে কালিয়াকৈর থানায় মামলা হয়। মেয়েটির মায়ের দায়ের করা এ মামলায় সজলকে হাজির করতে চাপ দেয় পুলিশ। পরে ১০ জানুয়ারি তাকে কালিয়াকৈরের ভাড়া বাড়িতে ডেকে আনেন লাভলী। এ সময় মৌচাক ফাঁড়ির পুলিশ অপহরণের অভিযোগে সজল ও তার ফুপু লাভলীকে গ্রেপ্তার করে। সজলের ফুপা আব্দুল মতিন বলেন, সজল ও লাভলী পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করেন- মেয়েটিকে তারা অপহরণ করেননি। কিন্তু এ কথা বিশ্বাস না করে পরদিন তাদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। আদালত তাদের কারাগারে পাঠান।

এদিকে গত ২৬ জানুয়ারি ভোরে পুলিশের কাছে খবর আসে, মেয়েটিকে কেউ মৌচাক-চা বাগান সড়ক দিয়ে একটি অটোরিকশায় বাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রনি কুমার। উদ্ধারের পর ওই কিশোরী জানায়, সজলের ফুপু লাভলী মামলা করলে জেলে যেতে হবে- এমন ভয় দেখিয়ে তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে মাসুদ রানা নামে সম্পর্কে তার এক চাচা। ভুল বুঝিয়ে তাকে নোয়াখালী নিয়ে যায় মাসুদ। সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে মেয়েটিকে একাধিকবার ধর্ষণ করে সে। মাসুদের হাতে-পায়ে ধরে মেয়েটি অনেক কান্নাকাটি করলে ২৬ জানুয়ারি ভোরে মৌচাক বাসস্টেশন এলাকায় অপরিচিত এক লোক দিয়ে বাসায় পাঠায়। মেয়েটি আরও জানায়, এ ঘটনার সঙ্গে সজল ও তার ফুপু জড়িত নন।

ভুক্তভোগী কিশোরী সমকালকে জানায়, তাকে ভুল বুঝিয়ে নোয়াখালী নিয়ে প্রায় ২৫ দিন আটকে রেখে যৌন নির্যাতন চালিয়েছে মাসুদ রানা। গাজীপুরের আদালতে ২২ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতেও সে এ কথাই বলেছে।

ওই কিশোরীর মা ও বাবা সমকালকে বলেন, মামলায় উল্লিখিত আসামিরা আমাদের মেয়েকে অপহরণ করেনি; কিন্তু তাদের কারণেই এতসব ঘটনা ঘটেছে। তারা দাবি করেন, মেয়েকে মাসুদের অপহরণের বিষয়টি তারা জানতেন না। আর এ ঘটনার সঙ্গেও তাদের কোনো সংশ্নিষ্টতা নেই।

এদিকে গ্রেপ্তার সজলের বড় ভাই স্বপন মিয়া বলেন, মেয়েটিকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চেয়েছিল সজল। এ অপরাধে মেয়েটির মা অপহরণের মিথ্যা মামলা দিয়ে আমার ফুপু ও ছোট ভাইকে জেল খাটাচ্ছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রনি কুমার জানান, মামলায় গ্রেপ্তারকৃতরা অপহরণে জড়িত নন। কিন্তু গত ২ জানুয়ারি মেয়ের বাসায় গিয়ে সজলের ফুপু লাভলী নানাভাবে হুমকি দিয়েছেন। মেয়েটিকে মাসুদ রানা মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে নোয়াখালী নিয়ে যায়। মাসুদের বাড়িও নোয়াখালী।

কালিয়াকৈর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজিব চক্রবর্তী জানান, সজল ও তার ফুফু লাভলী অপহরণে জড়িত না থাকলে তাদেরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। অভিযুক্ত মাসুদ রানাকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই বোঝা যাবে মামলায় উল্লিখিত আসামিরা জড়িত কিনা।