ইভার ছোট্ট কাঁধে অনেক বড় ভার। লেখাপড়ার পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের হাল ধরতে জীবন-সংগ্রামে নেমেছে সে অতি অল্প বয়সেই। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস অসুস্থ বাবার মুদি দোকান সামলাতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে পরিবারের অন্যদের দেখভালের দায়দায়িত্বের অনেকখানিও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। নিজের লেখাপড়াও সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছে মেধাবী এই মেয়েটি।
মোসাম্মৎ ইভা মনি নামের সাড়ে ১৫ বছর বয়সী এই মেয়েটির বসবাস রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুরশা ইউনিয়নের বিষুষ্ণপুর গ্রামে। স্থানীয় তারাগঞ্জ হাই স্কুলের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সে। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে স্কুল ও এলাকায় বেশ সুনাম রয়েছে ওর। বাবা টরপা মাবুদ (৪৮) অনেক দিন ধরেই অসুস্থ। হার্নিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক জটিলতায়
চিকিৎসা নিতে হচ্ছে নিয়মিতই। আগে দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালালেও এখন অসুস্থতার কারণে সেটাও বন্ধ মধ্যবয়স্ক মানুষটির। তিন শতাংশ জায়গার ওপর জীর্ণশীর্ণ বাড়ির এক কোণে মুদি দোকান দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতে হয় অসুস্থ মানুষটিকে। সেই দোকানে চা, পান ও বিড়ির সঙ্গে ছোটখাটো জিনিসপত্র বিক্রি হয়ে থাকে।
কিন্তু অসুস্থতার কারণে ঠিকমতো দোকানেও বসতে পারেন না টরপা মাবুদ। তার স্ত্রী আলিয়া বেগমকে (৩৫) ঘর গৃহস্থালি আর স্বামীকে দেখাশোনার কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় বেশি। তাদের বড় মেয়ে ইশরাতের বিয়ে হয়ে গেছে আগে। গ্রামেরই পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্বামী-সন্তান নিয়েই তার বসবাস। এর পরের মেয়েই ইভা মনি। সবশেষে ছোট ছেলে মোহাম্মদ ইমন খান স্কুলশিক্ষার্থী, স্থানীয় ফরিদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ছেলেটিও বেশ মেধাবী। তবে বয়স মাত্র ৯ বছর হওয়ায় তার পক্ষে পরিবারের কোনো দায়িত্ব নেওয়া সম্ভবও নয়। ফলে বাবার দোকান দেখাশোনার ভার এসে পড়েছে মেয়ে ইভা মনির ওপরই। সেই সঙ্গে পুরো পরিবারের দায়িত্বটাও এসে পড়েছে ওর ওপরই। সেটাও ভালোভাবেই সামলাচ্ছে মেয়েটি।
এই মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলো এক পড়ন্ত বিকেলে। ইভা তার বাবার দোকানে বসে নিপুণ হাতে জাতি দিয়ে সুপারি কাটছিল। মুহূর্তের মধ্যেই সুপারিগুলো কুচি কুচি হয়ে উঠছিল, যেন সেটাও একটা শিল্প। একটু সময় পরই গ্রামেরই একজন ক্রেতা চা খেতে এলেন। সুপারি কাটা বাদ রেখে ইভা দক্ষ হাতে মুহূর্তেই চা-ও বানিয়ে ফেলল। তারপর গরম পানিতে ধোয়া কাপে সেই চা পরিবেশনও করল অভিজ্ঞ বিক্রেতার মতোই।
ইভা মনি সমকালকে বলেছে, অভাবের সংসার তাদের। এর ওপর বাবা অসুস্থ। বড় বোনটা বিয়ের পর থেকে অন্যত্র থাকছে। একমাত্র ভাইটাও অনেক ছোট। তাই তাকেই পরিবারের সব ভার নিতে হয়েছে। তার স্বপ্ন লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে চাকরি করবে। সংসারের অভাবও ঘুচাবে। সেই সঙ্গে ছোট ভাইকেও মানুষের মতো মানুষ করে তোলার প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে।
সংসারের ভার সামলানোর কারণে লেখাপড়ায় ক্ষতি হয় কিনা- এমন প্রশ্নে ইভা জানাল, এখন করোনার কারণে স্কুল বন্ধই রয়েছে। ফলে দোকান ও সংসারের দেখাশোনার পরও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে তেমন একটা অসুবিধা হচ্ছে না। আর স্কুল বন্ধ থাকার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্থানীয় একজন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেটও পড়ছে সে।
স্থানীয় গ্রাম পুলিশ মো. মমতাজও তুলে ধরলেন ইভা মনির অল্প বয়সেই জীবন-সংগ্রামে নেমে পড়ার গল্প। তিনি বললেন, অভাব-অভিযোগে খুব কষ্টে রয়েছে ইভা ও তার পরিবারটি। এর পরও হাল ছাড়তে নারাজ সে। এখন বিত্তবান মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা পেলে হয়তোবা তাদের কষ্টের দিনের অবসান ঘটতে পারে।


বিষয় : জীবন-সংগ্রাম

মন্তব্য করুন