স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নানের বাড়িতে হামলা হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত দফায় দফায় হামলার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচিবকে অবরুদ্ধ করে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ারও আল্টিমেটাম দিয়েছে সশস্ত্র কয়েকশ’ হামলাকারী। এ সময় তার প্রটোকলে থাকা কটিয়াদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশরাফুল আলমকে বেধড়ক মারধরও করা হয়েছে। তাকে মারতে মারতে পুকুরে ফেলে দেয় হামলাকারীরা।

স্বাস্থ্যসচিবের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার চান্দপুর গ্রামে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় ঘটনাস্থলে থাকা কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. মুজিবুর রহমান আত্মরক্ষার্থে কোনো রকমে গাড়িতে ওঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এছাড়া হামলায় নির্মাণাধীন কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বরত প্রকৌশলীসহ অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নানের অভিযোগ, স্থানীয় (কিশোরগঞ্জ-২, কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া আসনের) সংসদ সদস্য সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদের নির্দেশে তার লোকজন ভাঙচুর, মারপিট, হুমকিসহ এ তাণ্ডব চালিয়েছে। এমন অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি তাকে আর কোনোদিন হতে হয়নি বলেও জানান তিনি।

তবে স্বাস্থ্যসচিবের অভিযোগের জবাবে সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ বলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি ওয়াকফের জমি দখল করেন, এলাকায় যা খুশি তা করে বেড়ান। এমনকি অন্যের ও মাজারের জমি দখল করে তিনি কমিউনিটি ক্লিনিক করছেন। এসব ব্যাপারে লোকজন প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর পায় না। এলাকার মানুষ তার অবজ্ঞা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের শিকার হওয়ায় তারা রুখে দাঁড়িয়েছে। এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ঘটনাটি ঘটেছে। এলাকার এমপি হিসেবে এলাকাবাসীর এই কাজ পরোক্ষভাবে হলেও আমার ওপরই বর্তায়।

এদিকে স্বাস্থ্যসচিবের বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার খবরে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম, পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ, র্যা বের ভৈরব ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিউদ্দিন মোহাম্মদ জুবায়ের, কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তাহিয়াত চৌধুরী, হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী, কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. আক্তারুন্নেছা, ওসি এমএ জলিল প্রমুখ ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

স্বাস্থ্যসচিবের বাড়ির সামনে হামলাকারীদের অবস্থান- সমকাল

এ পরিস্থিতিতে রোববার পূর্বনির্ধারিত কিশোরগঞ্জ জেলা পর্যায়ের করোনাভাইরাস টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের উপস্থিতি বাতিল করে শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে র‌্যাব ও পুলিশের কড়া প্রহরায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন স্বাস্থ্যসচিব মো. আবদুল মান্নান।

দুপুর ১টার দিকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে মানিকখালী বাজারেই উত্তেজনার আঁচ পাওয়া যায়। পুলিশের তাড়া খেয়ে লাঠিসোটা হাতে শতাধিক যুবক মানিকখালী রেলস্টেশনের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। সেখান থেকে মিনিট দশেকের দূরত্ব পেরিয়ে নির্মাণাধীন কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, টিনের তৈরি শ্রমিকদের ঘরটির টিন খুলে নেওয়া হয়েছে। ঘরটির প্রায় প্রত্যেকটি টিন কুপিয়ে তছনছ করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ভবনের রড খোলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। সেখানেই পাওয়া যায় হামলায় আহত নির্মাণ শ্রমিক কমল, সুজন মিয়া, নূরুল ইসলাম, সুজন ও চয়নকে। তারা বলেন, সকালে তারা যখন কাজ করছিলেন, হঠাৎ তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। তাদের নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে নামতে পর্যন্ত সময় দেয়নি হামলাকারীরা। এ ছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য নির্মাণাধীন রাস্তার মাটি কাটার মেশিনের চালককে পর্যন্ত পিটিয়ে আহত করা হয়।

স্বাস্থ্যসচিবের বাড়িতে হামলার সময় পাশের বাড়ি থেকে ঘটনাটি দেখেছেন প্রতিবেশী কলেজছাত্র মোয়াজ্জিম হোসেন। তিনি বলেন, দুই থেকে তিনশ’ জন হামলাকারী এসে সচিব সাহেবের বাড়িতে চড়াও হয়ে উনাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। হামলাকারীরা উনাকে হত্যার হুমকি দেয় এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার আল্টিমেটাম দেয়।

আরেক প্রতিবেশী মো. ফজলুর রহমান বলেন, সচিব সাহেব তখন বাসার দোতলায় অবস্থান করছিলেন। দুই, আড়াইশ’ লোক এসে তাকে বাড়ি ছাড়ার জন্য পাঁচ মিনিটের আল্টিমেটাম দেয়। সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ সাহেবের ভাগ্নে মুন সাহেব ও পিএস লিটন হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মো. তারেকুজ্জামান বলেন, হামলাকারীরা স্বাস্থ্যসচিবের বাড়িতে এসে গালিগালাজ ও হুমকি-ধামকি শুরু করলে সচিবের প্রটোকলে থাকা কটিয়াদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল আলম এগিয়ে আসেন। এ সময় তাকে রড দিয়ে পেটাতে পেটাতে পুকুরে ফেলে দেয় হামলাকারীরা। সেখান থেকে তাকে আবার তুলে টেনে-হিঁচড়ে মারধর করে গাড়িতে উঠিয়ে দেয় তারা।

কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. আক্তারুন্নেছা জানান, এসিল্যান্ড আশরাফুল আলমের আহত হওয়ার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। দুজনের মধ্যে পথে ক্রসিং হয়। উনি চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যসচিব আবদুল মান্নান বলেন, প্রথম ১০ থেকে ১৫ জনের যে দলটি এসেছিল, তাদের আমি বলি কমিউনিটি ক্লিনিক হচ্ছে, রাস্তা হচ্ছে। এসব কাজ জনগণের উপকারের জন্য করা হচ্ছে। আমরা ভূমি দিয়েছি, সরকার টাকা দিচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অবগত আছেন। জনগণের কাজ তোমরা বন্ধ করে দেবে কেন? এ সময় তারা বলে, ভালো কাজ হচ্ছে বলেই তো চাঁদা দিতে হচ্ছে না। এখন এমপি সাহেব নির্দেশ দিয়েছেন কাজ বন্ধ থাকবে। তাই কাজ বন্ধ করতে এসেছি। এর কিছুক্ষণ পরই ৬০ থেকে ৭০ জনের সন্ত্রাসী দল এসে এলোপাতাড়িভাবে মারপিট শুরু করে। তাদের হাতে আহত হন এসিল্যান্ড, প্রকৌশলীসহ ১০ থেকে ১২ জন।