মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভায় স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মসিউর রহমান সবুজ তাকে পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মাহবুব হাসানের জিম্মায় ঢাকায় আনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন। তার দাবি, এসপির গাড়িতে তাকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে নেওয়া হয়। সেখানে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয় তাকে। এ জেলার শিবচরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়েছিলেন ওই থানার ওসি মিরাজ হোসেন।

নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক নানা বিতর্কের মধ্যে এই দুই ঘটনায় কোনো মন্তব্য করতে চাননি নির্বাচন কমিশনের কেউ। তবে বিশ্নেষকরা বলছেন, অভিযোগ দুটি নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ। তাই আলোচিত দুই পৌরসভায় নির্বাচন বন্ধ করে তদন্তের পর দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

শনিবার রাতে একজন প্রার্থী নিখোঁজ হওয়ার গুঞ্জনের জের ধরে কালকিনিতে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। জনতা থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে গেলে সংঘর্ষ বাধে। এতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। অথচ রোববার রাতে নির্বাচন কমিশন সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এই মাত্র সাংবাদিকদের মাধ্যমে ঘটনা শুনেছেন। বিস্তারিত কিছু জানেন না। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে কোনো তথ্য পেয়েছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা জানালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) অথবা সচিবকে জানাবেন। তারা ভালো বলতে পারবেন।

সিইসিকে মোবাইল ফোনে না পাওয়া গেলে ইসি কার্যালয়ের সচিব হুমায়ুন কবির খোন্দকার গতকাল রোববার রাতে সমকালকে জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি অবহিত নন। তা ছাড়া তিনি নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। সব বিষয় এখনও বুঝে উঠতে পারেননি। জেনেবুঝে মন্তব্য করতে চান।

এদিকে মাদারীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, তাদের কাছে কেউ অভিযোগ দেয়নি। তাই তারা কোনো কিছুই কমিশনকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। তবে সংবাদ মাধ্যমে খবর দেখে ইসি সচিবালয় থেকে তার কাছে দুপুরেই ঘটনা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, এখানে নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি পেশাগত শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধ হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী এলাকার সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইসির আদেশ মানতে বাধ্য। আর পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একজন প্রার্থীর প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাই নির্বাচন বন্ধ করে তদন্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এদিকে মাদারীপুর সংবাদদাতা জানান, নিখোঁজের প্রায় ১১ ঘণ্টা পর গতকাল এলাকায় ফিরে মসিউর রহমান সবুজ সমকালকে বলেন, শনিবার বিকেল ৫টার দিকে কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরকারি গাড়িতে উঠার পরই নিখোঁজ হন তিনি। রোববার ভোর পৌনে ৪টার দিকে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। সবুজ আরও বলেন, শনিবার বিকেলে হঠাৎ এসপি মুঠোফোনে কল করে তাকে দেখা করতে বলেন। এসপি থানার ওসিকে তার কাছে পাঠান। তিনি ওসির কাছ জানতে পারেন, আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে এসপি কথা বলবেন। তিনি সরল মনে ওসির গাড়িতে উঠে এসপির অফিসে যান। এসপি নিজের গাড়িতে উঠিয়ে তাকে ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ অফিসে নিয়ে যান। সেখানে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তার কথা হয়। তিনি তাকে নৌকার পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান। সবুজ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদককে জানান, তিনি দলের কোনো পদে নেই। এ সময় ওবায়দুল কাদের তাকে জানান, দলের সিদ্ধান্ত মানলে তাকে দলের ভালো অবস্থানে রাখা হবে।

সূত্র জানায়, পুলিশের গাড়িতে উঠার পর সবুজের নিখোঁজ সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে তার সমর্থকরা বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে অংশ নেয়। একপর্যায়ে নৌকার সমর্থকদের সঙ্গে সবুজের সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। তিন ঘণ্টার সংঘর্ষ চলাকালে দু'পক্ষের হাতে লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র দেখা যায়। সংঘর্ষের সময় ককটেল বিস্টেম্ফারণ ও গুলির শব্দও শোনা গেছে। শতাধিক দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।

এ বিষয়ে কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন মৃধা বলেন, নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি সবুজকে এসপির কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরের কিছু তার জানা নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মাহবুব হাসান মিটিংয়ে রয়েছেন বলে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

তদন্ত কমিটি :২ ফেব্রুয়ারি শিবচরে ওসিকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশের পক্ষ থেকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে ওসি মিরাজ হোসেন দাবি করেছেন, নিরাপত্তা রক্ষার জন্য তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রার্থীর সঙ্গে মিছিল কিংবা বাইরে একসঙ্গে ছিলেন না।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল হান্নানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রার্থীর সঙ্গে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন না। এটা আচরণবিধি লঙ্ঘন। এসপি মাহবুব হাসান বলেন, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় ওসি বা পুলিশ সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে থাকতে পারে। তবে প্রার্থীর সঙ্গে ওসির ছবি তোলার কথা নয়। ওসি যদি কোনা প্রার্থীর সঙ্গে একত্রিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন তাহলে সেটা ঠিক হয়নি।