চট্টগ্রাম বন্দরনগরের 'লাইফ লাইন' হিসেবে পরিচিত পোর্ট কানেকটিং সড়ক (পিসি রোড)। সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের উন্নয়ন কাজ পায় তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রানা বিল্ডার্স-সালেহ আহমদ (জেভি)। কিন্তু দেড় বছরের মধ্যে এ কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তিন বছরেও শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
অবশ্য কাজ শেষ করতে না পারলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কাছ থেকে ঠিকাদার মঈনউদ্দিন বাঁশি হাতিয়ে নিয়েছেন ৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ঋণের বিপরীতে দায়ী ব্যাংকের অগোচরে। তারপর লাপাত্তা হয়ে গেছেন কাজ বন্ধ করে। এ অবস্থায় চসিক গত ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির কার্যাদেশ বাতিল করেছে।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল সোহেল আহমেদ সমকালকে বলেন, 'গত এক বছরে একবারের জন্যও ঠিকাদারের মুখ দেখিনি। বারবার তাগাদা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি কাজ বন্ধ রেখেছেন। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্তও করা হয়েছে। সড়কটির বাকি কাজ শেষ করতে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হবে।' কাজ শেষ না করে বিল তুলে নেওয়া প্রসঙ্গে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, 'যতটুকু কাজ হয়েছে তা যৌথ পরিমাপের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা না এলে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কাজের পরিমাপ করা হবে। কাজের অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকলে তা আদায় করতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
চট্টগ্রাম নগরের নিমতলা থেকে অলংকার মোড় পর্যন্ত পিসি রোডের দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৬৫ কিমি.। এর মধ্যে নিমতলা থেকে তাসফিয়া পর্যন্ত ৩ দশমিক ৩৫ কিমি. অংশের উন্নয়নের কাজ পায় মেসার্স রানা বিল্ডার্স এবং সালেহ আহমদ (জেভি)। প্রতিষ্ঠানটির হয়ে কাজ করেছেন ঠিকাদার মঈনউদ্দিন বাঁশি। কাজের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। পরে তিন দফা সময় বাড়িয়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। তারপরও কাজ শেষ হয়নি। বরং লাপাত্তা হয়ে গেছেন ঠিকাদার মঈনউদ্দিন বাঁশি। কিন্তু কাজ শুরুর পরপরই ৯ দফায় করপোরেশন থেকে তিনি বিল তুলে নিয়েছেন ৬০ কোটি ১৩ লাখ ৩ হাজার ৫৫১ টাকা। এর মধ্যে ২৪ কোটি ৯১ লাখ ৯৬ হাজার ৩০৭ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন কার্যাদেশটির বিপরীতে ঋণ নেওয়া ইউসিবিএল ব্যাংকের কুমিল্লা শাখার অগোচরে। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহেশখাল রোডের উন্নয়ন এবং গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পেও কাজ না করে আট কোটি টাকা অগ্রিম হাতিয়ে নিয়েছেন এই ঠিকাদার।
জিম্মাদার ব্যাংকের মাধ্যমে না দিয়ে সরাসরি ঠিকাদারকে বিল দেওয়ায় চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে গত ৩১ জানুয়ারি বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। তবে মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন সমকালকে বলেন, 'ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে অ্যাসাইনমেন্ট ব্যাংককে বিল না দিয়ে সরাসরি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বরাবর বিল পরিশোধ করেছি।'
এ প্রসঙ্গে ঠিকাদার মঈনউদ্দিন বাঁশির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালালেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
সড়কটির তাসফিয়া কমিউনিটি সেন্টার থেকে কলকা সিএনজি স্টেশন পর্যন্ত এক দশমিক ৫৪ কিলোমিটার অংশের কাজ পান মেসার্স ইয়াকুব-ম্যাক। মেয়াদ ধরা হয় ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। পরে এক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ২৪ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু। রানা বিল্ডার্সের পাশাপাশি এ প্রতিষ্ঠানটির কার্যাদেশও বাতিল করা হয়েছে।
গত বছরের আগস্টে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দফায় দফায় সড়কটি পরিদর্শন করেন খোরশেদ আলম সুজন। গত ১ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষে বিদায় নেওয়ার পর আক্ষেপ করে তিনি বলেন, 'অনেক চেষ্টা করেও ঠিকাদারদের অবহেলার কারণে সড়কটির কাজ শেষ করা গেল না। বর্ষার আগেই এ রাস্তার কাজ শেষ না হলে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না।' তিনি বলেন, সড়কটির এমন বেহাল দশার কারণে স্থানীয়দের জীবনধারাই পাল্টে গেছে। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা এলাকা ছেড়ে বাইরে গিয়ে ঘর ভাড়া করে থাকছেন।


মন্তব্য করুন