টিনশেডের আধাপাকা একটি বাড়ি। অযত্ন-অবহেলায় সেটি পড়ে আছে কুমিল্লার ধর্মসাগরের পশ্চিমপাড়ে। ভেঙে পড়েছে এর টিনের চালা, দরজা-জানালা; খসে পড়ছে দেয়ালের পলেস্তারা। এসব দেখে মনেই হবে না, এখানেই বাস করতেন ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত; যিনি সর্বপ্রথম পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব তুলেছিলেন; যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হয়েছেন।
এই বাড়ি দেখে এ-ও বিশ্বাস হবে না যে, ২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে এই বাড়ি পরিদর্শন করতে এসেছিলেন তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। বলেছিলেন তিনি, এ বাড়িতে স্থাপন করা হবে 'ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি জাদুঘর'। কিন্তু সে জাদুঘর গত ১০ বছরেও গড়ে ওঠেনি।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন বাংলা প্রদেশের ত্রিপুরা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন। তার বাবা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার। ধীরেন্দ্রনাথ পড়াশোনা করেছেন নবীনগর হাই স্কুল, কুমিল্লা কলেজ ও কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। প্রথমে শিক্ষকতায় ও পরে আইন পেশায় যুক্ত হয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৪২ সালে 'ভারত ছাড়' আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখায়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস থেকে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য এবং একই বছরের শেষ দিকে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য পূর্ববঙ্গ থেকে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি গণপরিষদে উত্থাপন করেন। এতে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি সরকারের রোষানলে পড়েন। কয়েকবার কারাগারেও যেতে হয় তাকে। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ গভীর রাতে ধর্মসাগরের পশ্চিমপাড়ের টিনশেড বাড়িটি থেকে তাকে ও তার ছোট ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। নির্মম নির্যাতন চালানো হয় তাদের ওপর। তাদের মৃতদেহও কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধীরেন্দ্রনাথের বড় ছেলে সঞ্জীব দত্ত ছিলেন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার সাংবাদিক। স্ত্রী প্রতীতি দেবী বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের যমজ বোন। তাদের বড় মেয়ে আরোমা দত্ত বর্তমানে কুমিল্লার সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির ভেতরে-বাইরে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে আছে। বাড়ির সীমানাপ্রাচীর বলতে কোনো কিছু নেই। প্রায় দুই যুগ এ বাড়ির দেখভাল করতেন মুরাদনগরের এক রিকশাচালক সুধন মিয়া। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন তিনি। সুধনের পরিবার বাড়ির সামনে একটি চা স্টল দিয়ে সংসার চালাচ্ছে। বাড়ির দুটি কক্ষে বসবাস করেন এই পরিবারের সদস্যরা। এই বাড়ি দেখে বোঝার উপায় নেই, এখানে একসময় এমন জনপ্রিয় ও বুদ্ধিদীপ্ত রাজনীতিক বসবাস করতেন। কোনো স্মৃতিফলকও নেই কোথাও।
কুমিল্লা নাগরিক ফোরামের সভাপতি কামরুল আহসান বাবুল বলেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিরক্ষায় সরকারি-বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মহান ভাষার মাসে তার বাড়িতে ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি জাদুঘর গড়ে তোলার জোর দাবি জানাচ্ছি। একইভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার অগ্রণী সংগঠক রফিকুল ইসলামের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্যও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মোবাইল ফোনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি আরোমা দত্ত সমকালকে বলেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি সবাই উদাসীন। ফেব্রুয়ারি এলে আমাদের বাড়ি নিয়ে মিডিয়ায় সংবাদ হয়। কিন্তু তার জন্মবার্ষিকীতে কয়েকজন এতিম শিশুকে খাবার দেওয়ারও কি কেউ নেই কুমিল্লায়?
সংরক্ষিত নারী আসনের এই সাংসদ বলেন, সদিচ্ছা থাকলে নতুন প্রজন্মকে জানানোর জন্য ভিক্টোরিয়া কলেজ ও আদালতে তার নামে ফলক স্থাপনসহ ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেক কিছু করা যেতে পারে।

বিষয় : শহীদ ধীরেন্দ্রনাথের বাড়ি

মন্তব্য করুন