‘মায়ের এক ধার দুধের দাম- কাটিয়া গায়েরও চাম, পাপোষ বানালেও ঋণের শোধ হবে না, এমন দরদি ভবে কেউ হবে না আমার মা গো।’ ফকির আলমগীরের কণ্ঠে সরাসরি এই গান শুনে প্রবীণদের কেউ কেউ হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন, কেউ আবার গাল গড়িয়ে পড়া অশ্রু খুব নীরবে মুছে ফেলেন। অন্য রকম আয়োজনে এ যেন এক অন্য রকম দৃশ্য। সবহারা মানুষগুলোর হৃদয়ে জেগে উঠে ভিন্ন অনুভূতি। 

গণসঙ্গীত শিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীর তার ৭১তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে গাজীপুরের মণিপুর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত মুকুলের বৃদ্ধাশ্রমে এসে প্রবীণদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। প্রবীণদের সঙ্গে গল্প করেছেন, তাদের গান শুনিয়েছেন। 

সোমবার বিকেলে ওই প্রবীণ নিবাসের ভেতরে ‘ আনন্দ আয়োজন ’ শিরোনামে ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী ফকির আলমগীরের জন্মদিন উপলক্ষ্যে এ আয়োজন করে। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমেই ফকির আলমগীর বাঁশের বাঁশিতে পল্লী সুরের ঝংকার তুলেন। 

বাঁশি বাজানো শেষে তিনি বলেন, যাদের জীবন অবহেলিত বিপন্ন, যারা একাকীত্ববোধ করেন, যারা নিরানন্দ বোধ করেন তাদের সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন করা আমার আগেরই ঘোষণা। জাতীয় যাদুঘরে যখন ৭০তম জন্মদিন করেছিলাম তখন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বলেছিলাম আর কোনো চাকচিক্য আধুনিক আলোকোজ্জল সমাবেশে আমার জন্মদিন করব না। যতদিন বেঁচে থাকব কখনো বৃদ্ধাশ্রমে, কখনো পথশিশু, কখনো কুলি, কখনো মজুদের সঙ্গে একাত্ব হয়ে আমি আমার জন্মদিন পালন করব। 

এরপর তিনি সঙ্গে থাকা একটি জাতীয় পতাকা প্রবীণদের উপহার দেন। আবদুল হালিম নামে এক প্রবীণের শরীরে পতাকাটি জড়িয়ে দেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, ফকির আলমগীর এমন একজন মানুষ যিনি সবসময় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সঙ্গীতের মাধ্যমে লড়াই করে গেছেন। বয়স্ক পুনঃর্বাসন কেন্দ্রে যারা আছেন, আমরা জানি একাকী বসবাসের কী যে যন্ত্রণা। অনেক দুঃখ ব্যথা ও যন্ত্রণা নিয়ে এখানে যারা আছেন তাদের সঙ্গে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির জন্মদিন আমরা উদযাপন করছি।’

ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। অনুষ্ঠানের অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে ফকির আলমগীর বড় একটি কেক কাটেন। বেলুন উড়ানো হয়। প্রবীণরা এসে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। চারদিকে যখন অন্ধকার নেমে আসে তখন শুরু হয় গানের আসর। সঙ্গীত পরিবেশন করেন ফকির আলমগীরসহ খ্যাতিমান শিল্পীরা। তাদের গান শুনে মুগ্ধ হন নিবাসের বাসিন্দারা। 

বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল জাহিদ মুকুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত সাংষ্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, একুশে পদক অভিনেত্রী সালমা বেগম সুজাতা, কন্ঠশিল্পী মো. খুরশিদ আলম, গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল জাকী, গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল শেখ প্রমুখ।

বিষয় : ফকির আলমগীর বৃদ্ধাশ্রম

মন্তব্য করুন