বগুড়ায় দুই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জীবিত থাকলেও পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে মৃত দেখিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। ফলে ১০ বছরেরও বেশি আগের মামলাগুলোর সাক্ষ্য গ্রহণ বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বাদীপক্ষ মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলার বিশেষ জজ আদালতে আবেদন করেছেন।

বগুড়ার ধুনট উপজেলার কৈগাতি গ্রামের বাসিন্দা হাসান আলী তালুকদার এবং তার চাচাতো ভাই নুরুন্নবী তালুকদার গত ২৭ জানুয়ারি ও ৭ ফেব্রুয়ারি পৃথক দুটি আবেদন দাখিল করেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বগুড়ার পুলিশ সুপারকে মামলা দুটির (নং ৫৫২/১২ ও ৪৯৬/১১) পরবর্তী ধার্য তারিখের (২৩ ফেব্রুয়ারি ও ৯ মার্চ) মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ি ইউনিয়রে নাগেশ্বরগাতি গ্রামে 'সাহেব উল্লাহ্‌ ওয়াকফ এস্টেট'-এর মালিকানাধীন প্রায় ৯ একর জমি নিয়ে ওয়ারিশদের সঙ্গে একই গ্রামের ইসমাইল হোসেনসহ তার ২০ সহযোগীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধভাবে ধান কাটা, হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট, ছিনতাই এবং চাঁদা দাবির অভিযোগে ওই ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি নুরুন্নবী তালুকদার বাদী হয়ে ইসমাইল হোসেনসহ তার ১১ সহযোগীর বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল ধুনট থানায় মামলা করেন। এর প্রায় সাত মাস পর ৫ নভেম্বর ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে দ্বিতীয় মামলাটি করেন নুরুন্নবীর চাচাতো ভাই হাসান আলী। এরপর ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ওই আসামিদের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যখন ওই তিনটি মামলা হয় তখন ধুনট থানায় 'আনোয়ার হোসেন' নামে দু'জন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) কর্তব্যরত ছিলেন। তাদের মধ্যে যিনি পরে যোগ দিয়েছিলেন তিনি 'আনোয়ার হোসেন-২' নামে পরিচিত ছিলেন। আর মামলা তিনটির মধ্যে ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল ও ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি করা মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় ধুনট থানার তৎকালীন এসআই আনোয়ার হোসেনকে। ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর করা দ্বিতীয় মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান আনোয়ার হোসেন-২ নামে অন্য এসআই।

তদন্ত শেষে এসআই আনোয়ার হোসেন দুটি মামলায় যথাক্রমে ২০১১ সালের ১৭ জুন এবং ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল পৃথক দুটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। একইভাবে আনোয়ার হোসেন-২ নামে অন্য পুলিশ কর্মকর্তাও ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর তার তদন্তাধীন মামলাটিরও চার্জশিট দাখিল করেন। ওই তিনটি মামলা পরে বিচারের জন্য বগুড়ার বিশেষ জজ আদালতে স্থানান্তরিত হয়। এসআই আনোয়ার হোসেনের চার্জশিটভুক্ত দুটি মামলা আদালতে যথাক্রমে ৪৯৬/১১ এবং ৫৫২/১২ ক্রমিকে নথিভুক্ত হয়। অন্যদিকে আনোয়ার হোসেন-২-এর দাখিল করা মামলার নম্বর পড়ে ১৮৭/১২। পরে আদালতে মামলাটি তিনটির সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।

আদালত সূত্র জানায়, ১৮৭/১২ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ধুনট থানার তৎকালীন এসআই আনোয়ার হোসেন-২-কে ২০২০ সালের ১২ মার্চ হাজির হতে আদালত থেকে ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়। তবে ৭ মার্চ বগুড়ার পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আদালতে চিঠি দিয়ে জানানো হয় যে, আনোয়ার হোসেন নামে সেই এসআই ২০১৮ সালের ৩ মার্চ মৃত্যুবরণ করেছেন। ওই চিঠির সঙ্গে এসআই আনোয়ার হোসেনের নিজ এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শিবনাথ মিশ্রের স্বাক্ষরে একটি মৃত্যুসনদও যুক্ত করা হয়। ফলে তার সাক্ষ্য ছাড়াই মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়।

অন্যদিকে বিচারাধীন ৫৫২/১২ এবং ৪৯৬/১১ নম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আরেক এসআই আনোয়ার হোসেনকেও সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য চলতি বছরের ১৪ ও ২১ জানুয়ারি হাজিরার জন্য পৃথক ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়। তবে পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে গত ৯ এবং ২০ জানুয়ারি জেলার বিশেষ জজ আদালতে পাঠানো চিঠিতে এসআই আনোয়ার হোসেন ২০১৮ সালের ৩ মার্চ মারা গেছেন উল্লেখ করে এর আগে এসআই আনোয়ার হোসেন-২-এর ওয়ারেন্টের বিপরীতে জমা দেওয়া নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত মৃত্যুসনদের একটি করে কপি সংযুক্ত করা হয়।

বিষয়টি বাদী পক্ষ জানার পর গত ২৭ জানুয়ারি এবং ৭ ফেব্রুয়ারি বিশেষ জজ আদালতে অভিযোগ করেন। তাতে ওই দুই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ধুনট থানার তৎকালীন এসআই আনোয়ার হোসেন মারা যাননি; বরং তিনি পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) হিসেবে বর্তমানে সিলেট মহানগর পুলিশের অধীন সিটিএসবিতে কর্মরত রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া জীবিত পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত দেখানোর বিষয়টিকে 'আদালতের সঙ্গে জালিয়াতি' উল্লেখ করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার অনুরোধও জানানো হয়।

ওই দুটি অভিযোগের কপি হাতে আসার পর অনুসন্ধানে নামে সমকাল। এরই মধ্যে সিলেট সিটিএসবিতে পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ধুনট থানার তৎকালীন এসআই আনোয়ার হোসেন অন্য এক মামলার সাক্ষী হিসেবে হাজিরা দিতে গত ২ ফেব্রুয়ারি বগুড়া আসেন। আদালত প্রাঙ্গণে তাকে ধুনট থানার ৫৫২/১২ এবং ৪৯৬/১১ নম্বরের মামলা দুটির চার্জশিট দেখালে তিনি বলেন, 'এই দুই চার্জশিট আমার নিজের লেখা। আমিই মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করেছিলাম।' তার মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্য এবং সঙ্গে যুক্ত করা মৃত্যুসনদ দেখালে তিনি বিস্মিত হয়ে বলেন, 'এটা তো আমার নয়। এটা আনোয়ার হোসেন-২-এর মৃত্যুসনদ। তার বাড়ি নওগাঁয়। তিনি মারা গেছেন। আর আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জে।'

ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ি ইউনিয়নের নাগেশ্বরগাতি গ্রামে গিয়ে দুই মামলার অন্যতম আসামি সিদ্দিক হোসেনকে এসআই আনোয়ার হোসেনের ছবি দেখিয়ে তার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ইনি তো আনোয়ার হোসেন। এই মামলাগুলা তদন্ত করছে। হুনছি তিনি মারা গেছেন।'

তবে মামলা দুটির একটির বাদী সাহেব উল্লাহ্‌ ওয়াকফ এস্টেটের মোতাওয়াল্লি নুরুন্নবী তালুকদারের অভিযোগ, রায় পক্ষে নেওয়ার জন্য আসামি পক্ষ পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে জীবিত তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতে মৃত দেখিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি জানার পর আদালতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আশা করি ন্যায়বিচার পাব।'

বগুড়ার বিশেষ জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী রোমান বলেন, অভিযোগ সত্যি হলে সেটি কী অসাবধানতাবশত ভুলে হয়েছে নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে তা করা হয়েছে, তার বিচার আদালত করবেন।

তবে বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা জালিয়াতির অভিযোগ মানতে নারাজ। সমকালকে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।