নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দু'পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কিরের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা। এ মৃত্যুর দায় নিতে নারাজ কোনো পক্ষই। উল্টো এটাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক মাঠ গরম করার চেষ্টা করছে বিবদমান দুই পক্ষ। আবার ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও কার বা কোন পক্ষের গুলিতে মোজাক্কির নিহত হয়েছেন, সেই রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

স্থানীয় সাংবাদিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও বলছেন, আওয়ামী লীগের দুই পক্ষ এবং পুলিশ- ত্রিমুখী গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল সেদিন। কার গুলিতে মোজাক্কির নিহত হলেন, সেই তথ্য বের হওয়া জরুরি। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থল চাপরাশির হাট পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে তারা সিসি ক্যামেরার একটি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। সেটা নিয়ে তারা কাজ করছে। অস্ত্রধারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

গুলিবিদ্ধ মোজাক্কিরকে প্রথমে নেওয়া হয় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সৈয়দ মহিউদ্দিন আব্দুল আজিম সমকালকে বলেছেন, মোজাক্কিরের শরীরে ছয়টি গুলি লেগেছে, যার সবই ছররা গুলি। এগুলো এলজি বা শটগানের গুলি হতে পারে।

র‌্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, শুধু পুলিশ নয়, সন্ত্রাসীরাও ছররা গুলি ব্যবহার করে। শটগান, পাইপগান ও এলজিতে ছররা গুলি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে নোয়াখালী অঞ্চলে এসব অস্ত্রের ব্যবহার বেশি।

নিহত সাংবাদিক মোজাক্কিরের বড় ভাই নুর উদ্দিন বলেন, গোলাগুলির ঘটনাটি শুক্রবার আসরের নামাজের পর ঘটেছে। সে সময় কারা গোলাগুলি করেছিল এবং কাদের ছোড়া গুলিতে মোজাক্কির গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, সেটা বাজারের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে রয়েছে। ওই ফুটেজটি পুলিশ হেফাজতে আছে। আমরা কাউকে দোষারোপ করছি না।

পুলিশের তদন্তে সঠিক তথ্য যেন উঠে আসে সেটাই চাই। তিনি বলেন, মোজাক্কিরের ব্যবহূত মোবাইল ফোনটি রোববার রাতে কেউ একজন তাদের বাড়িতে রেখে গেছেন। তার ক্যামেরাটি আজ (গতকাল) দুপুরে চাপরাশিরহাট বাজারের একটি দোকান থেকে তিনি নিয়ে এসেছেন।

গত শুক্রবার বিকেলে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার সাম্প্রতিক সময়ের নানা বক্তব্যের প্রতিবাদে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি চাপরাশিরহাটে এলে সেখানে অবস্থানকারী কাদের মির্জার অনুসারী চর ফকিরা ইউপি চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন লিটনের লোকজনের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও ১০-১২ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। ওই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির গুলিবিদ্ধ হন। আরও ছয়জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হন অর্ধশতাধিক। গত শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মোজাক্কির। তবে পুলিশ বলছে, দুই পক্ষের সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছে। পুলিশের গুলিতে কেউ হতাহত হয়নি।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এক সংবাদিক জানান, মির্জা কাদের ও বাদলের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের চিত্র ধারণ করার সময় সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির গুলিবিদ্ধ হন। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি একটি ফলের দোকানের পেছনে আশ্রয় নেন। সেখানে এক ঘণ্টার মতো আর্তনাদ করেন মোজাক্কির। কিন্তু তাকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। দ্রুত হাসপাতালে নিলে হয়তো তিনি বেঁচে যেতেন। অথচ মারা যাওয়ার পর কাদের মির্জা ও মিজানুর রহমান বাদল মুজাক্কিরকে নিজের অনুসারী বলে দাবি করছেন। এ মৃত্যুর ঘটনায় দুই পক্ষ একে অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। কাদের মির্জা বলেছেন, মোজাক্কির একজন ভালো সাংবাদিক ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে বাদলের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে তাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে। অন্যদিকে মিজানুর রহমার বাদল বলেছেন, সাংবাদিক মোজাক্কির তার এলাকার ছেলে এবং তার অনুসারী। তাকে মির্জা কাদেরের নেতৃত্বে তার লোকজন গুলি করে হত্যা করেছে।

মোজাক্কির নিহতের ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষে এখনও মামলা হয়নি। তবে শুক্রবারের গোলাগুলির ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল বাদী হয়ে ৪৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৬০০ জনকে আসামি করে কোম্পানীগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। একই ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ থানার এসআই রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৭০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলা দায়েরের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, কোম্পানীগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা এ মুহূর্তে নাজুক। আগে জনগণের নিরাপত্তা, তারপর আসামি গ্রেপ্তার।

এদিকে, সমকালের পক্ষ থেকে নিহত মোজাক্কিরের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার ভাই এমরান হোসেন বলেন, 'আমরা মামলা নিয়ে চাপে আছি। মন্ত্রীর (ওবায়দুল কাদের) লোকজন বলেন এক ধরনের মামলা করার জন্য। অন্যদিকে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল বলেন তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলা করতে। মামলার ব্যাপারে আমরা রাতে সিদ্ধান্ত নেব।' অবশ্য মোজাক্কিরের বড় ভাই নুর উদ্দিন বলেছেন, সোমবার ১৪৪ ধারা জারি থাকায় মামলা করতে থানায় যেতে পারেননি তারা। মামলার প্রস্তুতি রয়েছে। মামলায় কারও নাম উল্লেখ থাকবে না। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার (আজ) সকালে তার বাবা নোয়াব আলী মাস্টার বাদী হয়ে এ মামলা করবেন।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহিদুল হক বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের বিবদমান দ্বন্দ্বের কারণে এলাকা উত্তপ্ত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে। মামলা তদন্ত করার সময় পাচ্ছে না পুলিশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মামলাগুলো তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, শুক্রবারের সংঘর্ষের ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ পুলিশ সংগ্রহ করেছে। সংঘর্ষের সময় কারা অস্ত্র নিয়ে গুলি করেছিল, সেটি পুলিশ পর্যালোচনা করে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বসুরহাট রূপালী চত্বরে আওয়ামী লীগের কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখে। সেখানে ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই পৌর এলাকায় রাস্তায় কাঠের গুঁড়ি ও গাছ ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে আবদুল কাদের মির্জার অনুসারীরা। বিকেল ৩টায় কাদের মির্জার সংবাদ সম্মেলনও পণ্ড করে দেওয়া হয়। পরে দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি সাংবাদিক মুজাক্কিরের মৃত্যুতে রূপালী চত্বরে শোকসভা ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে। অথচ আমার বাড়ির পাশে নিজাম হাজারী সমাবেশ ডেকেছে। চরকাঁকড়ার টেকের বাজারে মিজানুর রহমান বাদলের নেতৃত্বে সমাবেশ হয়েছে। প্রশাসন কিছুই করছে না।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল বিকেলে মুজাক্কির হত্যার প্রতিবাদে টেকের বাজারে বিক্ষোভ সমাবেশে বলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয়- বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা মোজাক্কিরের জীবন নিয়ে ক্ষান্ত হননি, তিনি আরও রক্ত চান। তিনি আমাদের প্রিয় নেতা ওবায়দুল কাদের ও কেন্দ্রীয় নেতাদের চরিত্র হনন করছেন। আমি কোম্পানীগঞ্জবাসীকে অনুরোধ করব, আপনারা মির্জার একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কোম্পানীগঞ্জের সাধারণ মানুষকে মুক্ত করুন।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান ইউপি চেয়ারম্যানরা :প্রশাসনের বাধায় সংবাদ সম্মেলন করতে না পেরে বিকেলে রূপালী চত্বরের দলীয় কার্যালয়ে জড়ো হন কাদের মির্জার অনুসারী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানরা। এ সময় সাংবাদিকদের তারা বলেন, নোয়াখালীর এমপি একরামুল করিম চৌধুরী ও ফেনীর এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর নির্দেশে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে অশান্ত করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে অনুরোধ, আপনারা কোম্পানীগঞ্জের দিকে নজর দিন। কোম্পানীগঞ্জকে শান্তিপূর্ণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চরফকিরা ইউনিয়নের জামাল উদ্দিন লিটন, রামপুরের ইকবাল বাহার চৌধুরী, চরপার্বতীর মোজাম্মেল হোসেন কামরুল প্রমুখ।

এদিকে, ফেনীর দাগনভূঞায় সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির হত্যার প্রতিবাদে গতকাল মানবন্ধন ও সমাবেশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। সকালে শহরের আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের সামনে দাগনভূঞা প্রেস ক্লাবের আয়োজনে এই কর্মসূচি পালিত হয়। এ ছাড়া বসুরহাট সীমান্তের কাছে দক্ষিণ চাঁদপুর গ্রামে কাদের মির্জার বিরুদ্ধে ফেনী আওয়ামী লীগের বিশাল শোডাউন হয়েছে।