ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে নারীসহ এক দরিদ্র পরিবারের চার সদস্যকে বাড়ি থেকে আটক করেছিল পুলিশ। পরে তাদের থানা থেকে ছাড়াতে পুলিশের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। 

ভুক্তভোগী উপজেলার চর মরিচাকান্দি গ্রামের কাঠমিস্ত্রি সেলিম মিয়া টাকা ফেরত ও নিরাপত্তা চেয়ে মঙ্গলবার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (নবীনগর সার্কেল) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সোনারামপুর ইউনিয়নের চর মরিচাকান্দি গ্রামের হতদরিদ্র হক সাহেবের বাড়িতে গত বছরের ১ নভেম্বর রাত দেড়টার সময় বাঞ্ছারামপুর মডেল থানার এসআই রফিকুল ইসলাম, এএসআই আশরাফুল আলম ও মনিরসহ একদল পুলিশ অভিযান চালায়। এসময় হকসাবের ছেলে সেলিম মিয়া, তার ভাই হালিম মিয়া, তার স্ত্রী স্মৃতি বেগম এবং মামাতো ভাই মোস্তফাকে ওসি ডেকেছেন বলে থানায় নিয়ে যান এবং ৪ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত আটকে রাখেন। পরে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য চর মরিচাকান্দি গ্রামের আরিফ বিল্লাহ মানিক থানা থেকে ছাড়াতে আটকদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা নেন। পরে নিজে থানায় উপস্থিত থেকে আটকদের কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রাখেন। পরে তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ। কিন্তু বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সঙ্গে থাকা চারটি মোবাইল ফোন ও হালিম মিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র থানা থেকে মাসুম বিল্লাহ মানিক নিয়ে যান। তিনি সেসব মালামাল ফেরত না দেওয়ায় ভুক্তভোগীরা থানায় যোগাযোগ করেন। থানা থেকে জানানো হয় মানিক মিয়ার কাছে এগুলো দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেগুলো ফেরত দিতে তিনি আরো ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। এরপর ভুক্তভোগীরা একাধিকবার মানিকের বাড়িতে গেলেও টাকা ছাড়া সেগুলো দেননি তিনি। উল্টো তাদের মিথ্যা মামলার হুমকি ও মারধরের হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন অভিযোকারীরা।

অভিযোগকারী সেলিম মিয়া বলেন, বাঞ্ছারামপুর থানার দারোগা রফিক, আরশাফুল ও মনিরসহ আরো কয়েকজন পুলিশ বিনা কারণে আমাদের গ্রামের আরিফ বিল্লাহ মানিকের উপস্থিতিতে আমার তিন ভাই ও ভাইয়ের বউকে ওসি স্যার ডেকেছে বলে থানায় নিয়ে যায়। আরিফ বিল্লাহ মানিক আমাদের থানা থেকে ছাড়াতে টাকা লাগবে বলে আমার পরিবারকে জানান। পরে ধারদেনা ও সুধে এনে চারদিন পর আমার মা আরিফ বিল্লাহ মানিককে ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা দিলে পুলিশ আমাদের সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে থানা থেকে ছেড়ে দেয়। পরে আমাদের ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ও ভাইয়ের সঙ্গে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্র মানিক মিয়ার কাছে রয়েছে বলে জানতে পারি। তার কাছে এগুলো চাইলে তিনি আমাদের কাছে আরো ১০ হাজার টাকা দাবি করেন এবং হুমকি-দামকি দেন। তাই বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ দিয়েছি।

চর মরিচাকান্দি গ্রামের উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আরিফ বিল্লাহ মানিক জানান, 'তাদের ছাড়িয়ে আনতে আমি থানা গিয়েছিলাম, তবে তাদের কাছ থেকে কোন টাকা নেইনি। তাদের মোবাইল ও জতীয় পরিচয়পত্র আমার কাছে নেই। তাদের কোনো রকমের ভয়ভীতি আমি দেখাইনি, এটা মিথ্যা কথা।'

এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাঞ্ছারামপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম জানান, 'মাস তিনেক আগে চর মারিচাকান্দি গ্রাম থেকে এক নারীসহ চারজনকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে শুনেছি চর মরিচাকান্দি গ্রামের মানিক তাদের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়েছেন। আমরা কোন টাকা নেইনি।'

এএসআই আশরাফুল আলম জানান, 'আরিফ বিল্লাহ মানিক ওদের (ভুক্তভোগীরা) কাছ থেকে টাকা নিয়েছে বলে শুনেছি। যারা টাকা দিয়েছেন তাদের বলেছিলাম আপনারা থানায় একটা অভিযোগ করেন। তারা অভিযোগ করবেন বলে কয়েকবার থানায় এসেও অভিযোগ না করে চলে গেছেন।'

বাঞ্ছারামপুর মডেল থানার ওসি রাজু আহমেদ জানান, 'আমি বিষয়টি শুনেছি, বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। তবে এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই।'

এব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার( নবীনগর সার্কেল) মকবুল হোসেন জানান, চর মরিচাকান্দি গ্রামের সেলিম মিয়ার একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি আমি জানি। তাদের আমি আটক করতে বলেছিলাম, কারণ সেলিমের বোনজামাই হান্নান ডাকাতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে এমন তথ্য আমাদের কাছে ছিল। হান্নান শ্বশুরবাড়িতে থেকে ডাকাতি করতেন। তাকে ধরতে ও তথ্য জানতে তাদের থানায় আনতে বলেছিলাম। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আসামি থানায় রাখার ক্ষমতা নেই পুলিশের, তবে মামলার স্বার্থে তাদের রাখা হয়েছিল। এতদিন এই বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলেনি। এখন যেহেতু অভিযোগ পেয়েছি বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে মানিক নামের কোন ব্যক্তি টাকা নেওয়ার বিষয়টিও আমরা খতিয়ে দেখব ও তাকে ডাকাবো।'