আলামত হিসেবে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কিরের ব্যবহূত ডিএসএলআর ক্যামেরা ও অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন জব্দ করেছে পুলিশ। তবে ডিএসএলআর ক্যামেরায় কোনো মেমোরি কার্ড পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনটিতেও দেওয়া আছে প্যাটার্ন লক। লক হওয়ার আগে মোবাইলে থাকা তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে কিনা, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এ জন্য সেটিকে ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হবে। গতকাল মঙ্গলবার কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহিদুল হক রনি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মোজাক্কিরের ব্যবহূত মোবাইল ফোনটি গত রোববার রাতে কেউ একজন তাদের বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন। আর ক্যামেরাটি সোমবার দুপুরে চাপরাশিরহাট বাজারের একটি দোকান থেকে নিয়ে এসেছেন মোজাক্কিরের বড় ভাই নুর উদ্দিন। গত শুক্রবারের সংঘর্ষের ঘটনায় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষ ও পুলিশের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তারা ঘটনার সময় মোজাক্কিরকে ছবি তুলতেও দেখেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, অস্ত্রধারীদের ছবি তোলার কারণেই তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন সাংবাদিক মোজাক্কির। এ কারণে তাকে গুলি করে হত্যা করা হতে পারে। আর আলামত মুছে দিতে তার ক্যামেরার মেমোরি কার্ড সরিয়ে ফেলেছে তারা। সাধারণ মানুষসহ স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরাও বলেছেন, ঘটনাস্থল চাপরাশিরহাট বাজারে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই কারা মোজাক্কিরকে গুলি করেছে, সেই তথ্য বেরিয়ে আসবে। পুলিশ এরই মধ্যে চাপরাশিরহাট পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কিছু জানাতে পারেনি পুলিশ।
ওসি মীর জাহিদুল হক রনিও বলেছেন, ধারণা করা হচ্ছে ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা ক্যামেরার মেমোরি কার্ড নিয়ে গেছে। তারা কার্ড নিয়ে মূল আলামত মুছে দিয়েছে হয়তো। এখন মোজাক্কিরের ব্যবহূত মোবাইলটি ফরেনসিকে পাঠানো হবে। সেখানে যদি কোনো আলামত থেকে থাকে, তা কাজে লাগানো হবে। এর আগে ওসি জানিয়েছিলেন, বিবদমান দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে কোম্পানীগঞ্জ এখনও উত্তপ্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। মামলা তদন্ত করার সময় পাচ্ছে না। সংঘর্ষের ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সংঘর্ষের সময় কারা অস্ত্র নিয়ে গুলি করেছিল, সেটি পুলিশ পর্যালোচনা করে দেখছে।
থানায় হত্যা মামলা, তদন্তে পিবিআই :গতকাল সকাল ১১টার দিকে নিহত সাংবাদিক মোজাক্কিরের বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক নুরুল হুদা ওরফে নোয়াব আলী মাস্টার বাদী হয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তবে মামলায় কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। তিনি বলেছেন, আমরা আশাবাদী পুলিশ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করবে।
সকালে মামলা দায়েরের পর বিকেলে এর তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওসি মীর জাহিদুল হক রনি। তিনি বলেছেন, মামলায় কারও নাম উল্লেখ না করা হলেও যারা প্রকৃত অপরাধী, তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। আর মামলা যাতে ভিন্ন খাতে না যায়, সে জন্য তারা নিশ্চিত না হয়ে কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করবেন না। মোজাক্কির কার গুলিতে মারা গেছেন, তা নিশ্চিত হতে গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাধিক টিম কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, মামলা দায়েরের পর বাড়ি ফেরার পথে গণমাধ্যম কর্মীদের মুখোমুখি হন মোজাক্কিরের বাবা নুরুল হুদা ও বড় ভাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা নুর উদ্দিন মুহাদ্দিস। এ সময় দু'জনই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তান হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে নুরুল হুদা বলেন, ছেলেকে আর ফিরে পাব না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই চাওয়া, জীবদ্দশায় যেন সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি।
গতকালও উত্তপ্ত ছিল কোম্পানীগঞ্জ :বিগত দুই মাস আবদুল কাদের মির্জার 'সত্য বচন' নিয়ে চাপা উত্তেজনা ছিল কোম্পানীগঞ্জসহ পুরো জেলার রাজনীতিতে। স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব। কাদের মির্জার 'সত্য বচন' থেকে রক্ষা পাননি তার বড় ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও। প্রথমদিকে তার 'সত্য বচন'কে সমর্থন জানিয়ে স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে থাকলেও গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অনেকে সরে এসেছেন। কয়েকদিনের ধারাবাহিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সংবাদ সম্মেলনে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা থাকলেও গত শুক্রবার চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে প্রথম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধে। বসুরহাট পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে নিহত হন সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির। ওই ঘটনায় আরও ছয়জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হন অর্ধশতাধিক। এ নিয়ে পৌরসভার রূপালী চত্বরে সোমবার উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডাকলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। সব ধরনের গণজমায়েত ও সমাবেশে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেদিন উভয় পক্ষই ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ দেখায়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে মির্জার 'অপরাজনীতি' ও মোজাক্কির হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেন মিজানুর রহমান বাদল। এর জবাবে বসুরহাট পৌর শহরের রূপালী চত্বরে পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দেন কাদের মির্জাও। এ নিয়ে ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পৌর শহর। পরে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কর্মসূচি থেকে সরে আসে দুই পক্ষই। এদিনও পৌরসভার বেশ কিছু দোকানপাট ছিল বন্ধ। শহরের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ দেখা গেছে। মাঠে ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও।
টিকা জনসচেতনতার নামে কাদের মির্জার সমাবেশের চেষ্টা : বসুরহাট রূপালী চত্বরে করোনাভাইরাসের টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে জনসচেতনতামূলক সমাবেশের আয়োজন করেন মেয়র কাদের মির্জা। পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে সেটিও পণ্ড করে দেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কাদের মির্জা বলেন, এটা অন্যায়, এটা জুলুম। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কভিড ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রশাসন বিনা উস্কানিতে সমাবেশ পণ্ড করে দিয়েছে। অথচ চাপরাশিরহাট বাজারের প্রধান সড়কে মঞ্চ তৈরি করে প্রতিপক্ষ সমাবেশ করছে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউল হক মীর বলেন, 'বসুরহাট রূপালী চত্বরে কেউ সভা-সমাবেশ করতে পারবে না। চাপরাশিরহাটে চলাচলের পথ বন্ধ করে সমাবেশ করা যাবে না।'
সেই মঞ্চ গুটিয়ে নিলেন মির্জা কাদের :বসুরহাট পৌরসভার নির্বাচনের পর থেকেই শহরের রূপালী চত্বরে বাঁশের খুঁটি পুঁতে ও কাঠ দিয়ে মঞ্চ তৈরি করে বিতর্কিত বক্তব্যসহ নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন আবদুল কাদের মির্জা। দেড় মাস ধরে এ মঞ্চ থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ তুলে ধরতেন। অবশেষে মঞ্চটি গুটিয়ে নিলেন কাদের মির্জা। কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুপ্রভাত চাকমার উপস্থিতিতে গতকাল রাত ৯টা থেকে মঞ্চ সরানোর কাজ শুরু হয়।
সারাদেশে সাংবাদিকদের মানববন্ধন :বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন সাংবাদিকরা। এসব কর্মসূচিতে মোজাক্কির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান তারা। গতকাল নোয়াখালী, কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া, পাবনা, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরা, শরীয়তপুর, ফেনীর সোনাগাজী, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া, কুড়িগ্রামের চিলমারী, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা ও ভোলার চরফ্যাসনে এসব কর্মসূচি পালিত হয়।

বিষয় : কোম্পানীগঞ্জে সাংবাদিক হত্যা

মন্তব্য করুন